Site icon news100k

বাংলায় চালু হচ্ছে বিশ্বকর্মা যোজনা! নতুন সরকারের বড় ঘোষণা, কারা পাবেন ৩ লক্ষ টাকার ঋণ?

Spread the love

বাংলায় চালু হচ্ছে বিশ্বকর্মা যোজনা! নতুন সরকারের বড় ঘোষণা, কারা পাবেন ৩ লক্ষ টাকার ঋণ?

পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পালাবদলের পর এবার রাজ্যের সাধারণ মানুষের জন্য একের পর এক বড় ঘোষণা সামনে আসছে। নতুন সরকারের প্রথম ক্যাবিনেট বৈঠকের পর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী যে কয়েকটি সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন, তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে “বিশ্বকর্মা যোজনা”। বহুদিন ধরে যে প্রকল্প নিয়ে রাজ্য ও কেন্দ্রের মধ্যে টানাপোড়েন চলছিল, এবার সেটাই বাংলায় কার্যকর হতে চলেছে বলে জানানো হয়েছে।

এই ঘোষণার পর থেকেই রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে থাকা কারিগর, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, কুটির শিল্পের সঙ্গে যুক্ত মানুষদের মধ্যে নতুন আশার আলো দেখা দিয়েছে। কারণ এই প্রকল্পের আওতায় শুধু প্রশিক্ষণ নয়, মিলবে আর্থিক সহায়তা, আধুনিক যন্ত্রপাতি কেনার সুযোগ এবং জামানত ছাড়াই ঋণ।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের আগে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বাংলায় এসে যে প্রতিশ্রুতিগুলি দিয়েছিলেন, তার বাস্তবায়নের প্রথম ধাপ হিসেবেই এই সিদ্ধান্তকে দেখা হচ্ছে। অন্যদিকে সাধারণ মানুষের কাছে এটি কর্মসংস্থান এবং স্বনির্ভরতার বড় সুযোগ বলেই মনে করা হচ্ছে।

নবান্নের বৈঠক থেকে বড় ঘোষণা

সোমবার নবান্নে নতুন সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রিসভার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে মুখ্যমন্ত্রী জানান, দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা বিশ্বকর্মা যোজনার আবেদনগুলি এবার পুনরায় কেন্দ্রের এমএসএমই দফতরে পাঠানো হবে।

মুখ্যমন্ত্রী বলেন, রাজ্যের বহু মানুষ ইতিমধ্যেই আবেদন করেছিলেন। কামার, কুমোর, স্বর্ণকার, মালাকার, নাপিত, কাঠমিস্ত্রি থেকে শুরু করে বিভিন্ন পেশার মানুষ আবেদন জমা দিয়েছিলেন। কিন্তু আগের সরকার সেই আবেদনগুলি যথাযথভাবে পাঠায়নি বলে অভিযোগ তোলা হয়েছে।

নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর সেই সমস্ত আবেদন পুনরায় যাচাই করে দ্রুত পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়।

এই ঘোষণার পর থেকেই সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, এর ফলে বাংলার ঐতিহ্যবাহী শিল্প ও কারুশিল্প আবার নতুন গতি পাবে।

কী এই বিশ্বকর্মা যোজনা?

প্রধানমন্ত্রী বিশ্বকর্মা যোজনা হল কেন্দ্রীয় সরকারের একটি বিশেষ প্রকল্প। মূল উদ্দেশ্য হল দেশের ঐতিহ্যবাহী কারিগর এবং হাতের কাজের সঙ্গে যুক্ত মানুষদের আর্থিক ও প্রযুক্তিগতভাবে শক্তিশালী করা।

ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে বহু পরিবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বিভিন্ন কারুশিল্পের কাজ করে আসছেন। কিন্তু আধুনিক বাজারে প্রতিযোগিতা, অর্থাভাব, প্রশিক্ষণের অভাব এবং প্রযুক্তিগত পিছিয়ে পড়ার কারণে এই পেশাগুলির অনেকটাই সংকটে পড়েছে।

এই পরিস্থিতিতে কারিগরদের পাশে দাঁড়াতেই চালু করা হয় বিশ্বকর্মা যোজনা।

২০২৩ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর এই প্রকল্প আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়। প্রকল্পের মাধ্যমে ছোট ব্যবসায়ী এবং কারিগরদের জন্য একাধিক সুবিধা ঘোষণা করা হয়।

কারা এই প্রকল্পের সুবিধা পাবেন?

সরকারি নির্দেশিকা অনুযায়ী বহু ধরনের পেশার মানুষ এই প্রকল্পের আওতায় আসতে পারেন। যেমন—

এছাড়াও অন্যান্য ঐতিহ্যবাহী পেশার সঙ্গে যুক্ত মানুষও আবেদন করতে পারবেন বলে জানা গিয়েছে।

কেন গুরুত্বপূর্ণ এই প্রকল্প?

বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান সময়ে চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতা অত্যন্ত বেশি। সরকারি চাকরি সীমিত, বেসরকারি ক্ষেত্রেও অনিশ্চয়তা রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে স্বনির্ভর কর্মসংস্থানই ভবিষ্যতের বড় ভরসা হয়ে উঠছে।

বিশ্বকর্মা যোজনা সেই কারণেই গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ এই প্রকল্প শুধু টাকা দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর মাধ্যমে একজন সাধারণ কারিগরকে আধুনিক ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

যেমন—

এই সব সুবিধার ফলে ছোট কারিগরদের ব্যবসা আরও বড় আকার নিতে পারে।

প্রশিক্ষণের সময় মিলবে টাকা

এই প্রকল্পের অন্যতম বড় আকর্ষণ হল প্রশিক্ষণকালীন ভাতা।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, আবেদনকারীদের ৫ থেকে ৭ দিনের বেসিক ট্রেনিং দেওয়া হবে। এই প্রশিক্ষণের সময় প্রতিদিন ৫০০ টাকা করে স্টাইপেন্ড দেওয়া হবে।

অর্থাৎ প্রশিক্ষণ নেওয়ার সময়ও আয়ের সুযোগ থাকবে।

অনেকের মতে, এই সিদ্ধান্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দরিদ্র পরিবার থেকে আসা অনেক মানুষ শুধুমাত্র উপার্জন বন্ধ হয়ে যাওয়ার ভয়ে প্রশিক্ষণ নিতে পারেন না। সেখানে এই ভাতা বড় সহায়ক হবে।

আধুনিক যন্ত্রপাতি কেনার জন্য ১৫ হাজার টাকা

বর্তমান বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে গেলে আধুনিক সরঞ্জাম অত্যন্ত জরুরি।

অনেক কারিগরের কাছে সেই অর্থ না থাকায় তারা পুরনো যন্ত্রপাতি ব্যবহার করতে বাধ্য হন। ফলে উৎপাদনের মান কমে যায়।

এই সমস্যা সমাধানের জন্য প্রকল্পের আওতায় ই-ভাউচারের মাধ্যমে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে।

এই অর্থ দিয়ে আধুনিক যন্ত্রপাতি কেনা যাবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এর ফলে উৎপাদনের গতি যেমন বাড়বে, তেমনি পণ্যের মানও উন্নত হবে।

৩ লক্ষ টাকা পর্যন্ত ঋণ

বিশ্বকর্মা যোজনার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ নিঃসন্দেহে জামানতবিহীন ঋণ।

প্রকল্পের আওতায় মোট ৩ লক্ষ টাকা পর্যন্ত ঋণ পাওয়া যাবে।

এই ঋণ দু’টি ধাপে দেওয়া হবে—

সবচেয়ে বড় বিষয় হল, এই ঋণের জন্য কোনও জামানত লাগবে না।

সুদের হারও মাত্র ৫ শতাংশ রাখা হয়েছে।

সাধারণত ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে গেলে বহু নথিপত্র, গ্যারান্টার এবং সম্পত্তির কাগজ লাগে। সেখানে এই প্রকল্প ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য অনেক বড় সুযোগ তৈরি করতে পারে।

বাংলার অর্থনীতিতে কী প্রভাব পড়তে পারে?

অর্থনীতিবিদদের মতে, এই প্রকল্প সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে বাংলার গ্রামীণ অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন আসতে পারে।

কারণ বাংলার বহু পরিবার এখনও ঐতিহ্যবাহী পেশার উপর নির্ভরশীল।

যদি তারা সরকারি সহায়তা পান, তাহলে—

বিশেষত বাংলার মৃৎশিল্প, তাঁতশিল্প, কাঠের কাজ, ধাতব শিল্প আন্তর্জাতিক বাজারেও জনপ্রিয় হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

ডিজিটাল যুগে নতুন সুযোগ

সরকারি সূত্রে জানা গিয়েছে, প্রকল্পের আওতায় ডিজিটাল লেনদেনেও উৎসাহ দেওয়া হবে।

বর্তমানে অনলাইন ব্যবসার বাজার দ্রুত বাড়ছে। ছোট ব্যবসায়ীরাও এখন সোশ্যাল মিডিয়া এবং ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করছেন।

বিশ্বকর্মা যোজনার মাধ্যমে অনেক কারিগর প্রথমবার ডিজিটাল পেমেন্ট, অনলাইন মার্কেটিং এবং ই-কমার্স ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হতে পারেন।

এতে শুধু স্থানীয় বাজার নয়, দেশের বাইরেও পণ্য বিক্রির সুযোগ তৈরি হবে।

কারা আবেদন করতে পারবেন না?

সরকারি নির্দেশিকা অনুযায়ী কিছু শর্তও রাখা হয়েছে।

যেমন—

এই নিয়মগুলি প্রকল্পের সঠিক সুবিধাভোগী নির্বাচন করার জন্য রাখা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।

কীভাবে আবেদন করবেন?

এই প্রকল্পে অনলাইন এবং অফলাইন—দু’ভাবেই আবেদন করা যাবে।

অনলাইন আবেদন পদ্ধতি

১. সরকারি পোর্টালে গিয়ে রেজিস্ট্রেশন করতে হবে
২. আধার কেওয়াইসি সম্পন্ন করতে হবে
৩. প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে ফর্ম পূরণ করতে হবে
৪. দরকারি নথি আপলোড করতে হবে
৫. আবেদন জমা দিতে হবে

অফলাইন আবেদন

যারা অনলাইনে আবেদন করতে পারবেন না, তারা নিকটবর্তী কমন সার্ভিস সেন্টারে গিয়ে আবেদন করতে পারবেন।

সেখানে আধার এবং মোবাইল নম্বর ভেরিফিকেশন করে আবেদন সম্পন্ন করা যাবে।

রাজনৈতিক মহলে কেন বাড়ছে আলোচনা?

বিশ্বকর্মা যোজনাকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্কও কম নয়।

নতুন সরকার দাবি করছে, আগের সরকার ইচ্ছাকৃতভাবে আবেদনগুলি আটকে রেখেছিল। অন্যদিকে বিরোধীরা বলছে, বিষয়টি রাজনৈতিক প্রচারের অংশ।

তবে সাধারণ মানুষের কাছে মূল প্রশ্ন একটাই—কবে থেকে বাস্তবে সুবিধা পাওয়া যাবে?

বিশেষ করে যেসব পরিবার দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক সমস্যায় ভুগছেন, তাদের কাছে এই প্রকল্প অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

গ্রামীণ বাংলায় নতুন আশা

রাজ্যের বিভিন্ন জেলার কারিগরদের মধ্যে ইতিমধ্যেই আশার সঞ্চার হয়েছে।

মুর্শিদাবাদের স্বর্ণকার, বাঁকুড়ার মৃৎশিল্পী, নদিয়ার তাঁত শিল্পী, মালদার কাঠমিস্ত্রি—অনেকেই মনে করছেন এই প্রকল্প তাদের জীবনে নতুন পরিবর্তন আনতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হলে বাংলার বহু হারিয়ে যাওয়া শিল্প আবারও পুনরুজ্জীবিত হতে পারে।

যুব সমাজের কাছেও আকর্ষণীয়

বর্তমানে বহু যুবক চাকরির অভাবে সমস্যায় পড়ছেন। অনেকেই ছোট ব্যবসা শুরু করতে চান, কিন্তু পুঁজি পান না।

বিশ্বকর্মা যোজনা সেই সমস্যারও সমাধান করতে পারে।

কম সুদে ঋণ এবং প্রশিক্ষণ পাওয়ার ফলে যুব সমাজের মধ্যে স্বনির্ভরতার প্রবণতা বাড়তে পারে।

বিশেষ করে গ্রামে বসে ব্যবসা শুরু করার সুযোগ তৈরি হবে।

মহিলাদের অংশগ্রহণ বাড়বে?

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রকল্পে মহিলাদের অংশগ্রহণও উল্লেখযোগ্য হতে পারে।

কারণ বাংলার বহু মহিলা ঘরে বসে হস্তশিল্প, সেলাই, অলংকার তৈরি, মাটির কাজের সঙ্গে যুক্ত।

যদি তারা সরকারি সহায়তা পান, তাহলে মহিলা স্বনির্ভর গোষ্ঠীগুলিও আরও শক্তিশালী হতে পারে।

সামনে কী?

এখন নজর থাকবে বাস্তবায়নের দিকে।

কবে আবেদন প্রক্রিয়া শুরু হবে, কত দ্রুত ঋণ মিলবে, প্রশিক্ষণ কোথায় হবে—এই সমস্ত বিষয় নিয়ে বিস্তারিত নির্দেশিকা প্রকাশের অপেক্ষায় সাধারণ মানুষ।

তবে রাজনৈতিক পালাবদলের পর নতুন সরকারের এই ঘোষণা যে বাংলার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মহলে বড় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে, তা বলাই যায়।

বিশেষ করে ক্ষুদ্র শিল্প ও কারিগর সম্প্রদায়ের জন্য এই প্রকল্প আগামী দিনে কতটা কার্যকর হয়, সেটাই এখন দেখার।

Please follow and like us:
Exit mobile version