Box Office রণবীর সিংয়ের ‘ধুরন্ধর’ ঝড়ে ইতিহাস! পোস্ট-কোভিড যুগে ৩৭০০ কোটির ক্লাবে প্রথম ভারতীয় পুরুষ সুপারস্টা
Box Office
বলিউডে সময় বদলাতে বেশি সময় লাগে না। এক সময় যাঁকে ঘিরে সমালোচনা, ব্যর্থতা আর ট্রোলিং চলছিল, আজ তিনিই আবার বক্স অফিসের রাজা। Ranveer Singh যেন নতুন করে নিজের সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন। আর সেই প্রত্যাবর্তনের মূল অস্ত্র হয়ে উঠেছে ‘ধুরন্ধর’ ফ্র্যাঞ্চাইজি।
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক বক্স অফিসের হিসাব সামনে আসতেই চমকে উঠেছে সিনে দুনিয়া। পোস্ট-কোভিড সময়ে মুক্তিপ্রাপ্ত ছবিগুলির সম্মিলিত আয়ে রণবীর সিং ৩৭০০ কোটিরও বেশি গ্লোবাল কালেকশন ছুঁয়ে ফেলেছেন। শুধু তাই নয়, তিনি এখন পোস্ট-প্যান্ডেমিক যুগে বিশ্বের বাজারে ৩৭০০ কোটির গণ্ডি পার করা প্রথম ভারতীয় পুরুষ অভিনেতা।
এই সাফল্যের পর বলিউডে একটাই আলোচনা— “রণবীর কি আবার ইন্ডাস্ট্রির সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক শক্তি হয়ে উঠছেন?”
ব্যর্থতা থেকে প্রত্যাবর্তন – বদলে যাওয়া গল্প
কোভিডের পরে ভারতীয় সিনেমা জগৎ পুরোপুরি বদলে যায়। দর্শকদের রুচি পাল্টায়, ওটিটির জনপ্রিয়তা বাড়ে, আর বড় বড় তারকার ছবিও বক্স অফিসে মুখ থুবড়ে পড়তে শুরু করে। সেই কঠিন সময়ের অন্যতম বড় শিকার ছিলেন রণবীর সিং।
‘৮৩’ ছবিটি নিয়ে প্রত্যাশা ছিল আকাশছোঁয়া। ভারতীয় ক্রিকেটের ঐতিহাসিক বিশ্বকাপ জয়ের গল্প, বড় বাজেট, বিশাল প্রচার— সব মিলিয়ে মনে করা হয়েছিল ছবিটি কয়েকশো কোটি টাকার ব্যবসা করবে। কিন্তু বাস্তবে ছবির বিশ্বব্যাপী আয় দাঁড়ায় প্রায় ১৮৪ কোটি টাকায়। সমালোচকদের প্রশংসা পেলেও বাণিজ্যিক দিক থেকে ছবিটি প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি।
এরপর আসে ‘জয়েশভাই জর্দার’। ছবিটি মুক্তির আগেই সোশ্যাল মিডিয়ায় বেশ আলোচনা তৈরি হলেও প্রেক্ষাগৃহে দর্শক টানতে ব্যর্থ হয়। বক্স অফিসে এর আয় ছিল অত্যন্ত কম।
তারপর মুক্তি পায় ‘সার্কাস’। কমেডি ঘরানার এই ছবির উপরও ছিল বিশাল প্রত্যাশা। কিন্তু দুর্বল চিত্রনাট্য ও নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার কারণে ছবিটি কার্যত ভরাডুবি করে। তখন অনেকেই বলতে শুরু করেছিলেন, রণবীরের স্টারডম শেষ হয়ে যাচ্ছে।
কিন্তু অভিনেতা কখনও থেমে যাননি। বরং আরও জোরে ফিরে আসার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন।
‘রকি অউর রানি’ – আত্মবিশ্বাস ফেরানোর শুরু
রণবীরের কেরিয়ারে নতুন আলো এনে দেয় Rocky Aur Rani Kii Prem Kahaani। পারিবারিক আবেগ, রোম্যান্স, মজাদার সংলাপ এবং বড় মাপের মিউজিক— সব মিলিয়ে ছবিটি দর্শকদের মন জয় করে।
ছবিটি বিশ্বব্যাপী প্রায় ৩৪৮ কোটির ব্যবসা করে। যদিও এটিকে মেগা ব্লকবাস্টার বলা যায় না, কিন্তু এই ছবিই রণবীরকে নতুন আত্মবিশ্বাস দেয়। সমালোচকরা বলেন, “রণবীর আবার নিজের শক্তির জায়গায় ফিরছেন।”
এই ছবির পরই শুরু হয় তাঁর কেরিয়ারের সবচেয়ে বড় অধ্যায়।
‘ধুরন্ধর’ – যে ছবি বদলে দিল সবকিছু
বলিউডে বহুদিন পরে এমন একটি অ্যাকশন-ড্রামা ফ্র্যাঞ্চাইজি আসে যা ভারতীয় দর্শকদের পাশাপাশি বিদেশি বাজারেও ঝড় তোলে। Dhurandhar মুক্তির পর থেকেই একের পর এক রেকর্ড ভাঙতে শুরু করে।
ছবিটির প্রধান আকর্ষণ ছিল রণবীর সিংয়ের সম্পূর্ণ নতুন অবতার। দুর্দান্ত অ্যাকশন, স্টাইলিশ স্ক্রিন প্রেজেন্স, আবেগঘন অভিনয় এবং বিশাল স্কেল— সবকিছু মিলিয়ে দর্শক যেন নতুন রণবীরকে আবিষ্কার করেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘ধুরন্ধর’ শুধু একটি সিনেমা নয়, বরং এটি ছিল একটি “ইভেন্ট ফিল্ম”।
বিশ্বব্যাপী ছবিটির মোট আয় দাঁড়ায় প্রায় ১৩৫৪ কোটি টাকা। এই সাফল্যের পর বলিউডে নতুন করে সুপারস্টার হিসেবে প্রতিষ্ঠা পান রণবীর।
‘ধুরন্ধর ২’ – রেকর্ড ভাঙার মহাযজ্ঞ
প্রথম ছবির বিশাল সাফল্যের পর দর্শকদের প্রত্যাশা ছিল আকাশছোঁয়া। আর সেই প্রত্যাশাকেও ছাপিয়ে যায় Dhurandhar 2।
মুক্তির প্রথম সপ্তাহ থেকেই ছবিটি বক্স অফিসে আগুন ধরিয়ে দেয়। ভারতের পাশাপাশি উত্তর আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ এবং দক্ষিণ ভারতের বাজারেও অভাবনীয় সাফল্য পায় সিনেমাটি।
বিশেষ করে দক্ষিণ ভারতে ছবিটির জনপ্রিয়তা সবাইকে অবাক করেছে। তামিল, তেলুগু এবং মালয়ালম ডাব সংস্করণেও দর্শকদের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো।
৫৫ দিন পরেও ছবিটি একাধিক দেশে সফলভাবে চলছে। বর্তমান হিসাব অনুযায়ী ‘ধুরন্ধর ২’-এর বিশ্বব্যাপী আয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৮৩৩ কোটি টাকায়।
এটি শুধু রণবীরের কেরিয়ারের সবচেয়ে বড় হিট নয়, বরং ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে অন্যতম বড় আয়কারী ছবিগুলির তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে।
পোস্ট-কোভিড যুগে রণবীরের ছবির মোট আয়
চলুন এক নজরে দেখে নেওয়া যাক কোভিড পরবর্তী সময়ে রণবীর সিংয়ের মুক্তিপ্রাপ্ত ছবিগুলির বিশ্বব্যাপী আয়—
- ‘83’ – ১৮৪.৩৬ কোটি
- ‘জয়েশভাই জর্দার’ – ২৪.১ কোটি
- ‘সার্কাস’ – ৩৯.৬ কোটি
- ‘রকি অউর রানি কি প্রেম কাহানি’ – ৩৪৮.৮৯ কোটি
- ‘ধুরন্ধর’ – ১৩৫৪.৮৪ কোটি
- ‘ধুরন্ধর ২’ – ১৮৩৩.৫৬ কোটি
মোট সংগ্রহ – ৩৭৮৫.৩৫ কোটি টাকা।
এই বিশাল অঙ্কই এখন ভারতীয় চলচ্চিত্র জগতের নতুন ইতিহাস।
শাহরুখ ও প্রভাসকে পিছনে ফেললেন রণবীর
ভারতীয় সিনেমায় পোস্ট-কোভিড যুগে সবচেয়ে বড় বক্স অফিস তারকাদের তালিকায় এতদিন শীর্ষে ছিলেন Shah Rukh Khan এবং Prabhas।
শাহরুখ খানের একাধিক বড় ছবি বিশ্বব্যাপী বিপুল ব্যবসা করেছে। অন্যদিকে প্রভাসের প্যান-ইন্ডিয়া জনপ্রিয়তাও অত্যন্ত শক্তিশালী।
কিন্তু ‘ধুরন্ধর’ ফ্র্যাঞ্চাইজির সুবাদে রণবীর এখন তাঁদের থেকেও এগিয়ে গিয়েছেন। রিপোর্ট অনুযায়ী, পোস্ট-কোভিড মুক্তিপ্রাপ্ত ছবিগুলির মোট আয়ে শাহরুখের সংগ্রহ প্রায় ২৭০৪ কোটি এবং প্রভাসের প্রায় ২৩৯৩ কোটি টাকা।
সেখানে রণবীরের মোট আয় ৩৭৮৫ কোটিরও বেশি।
ফলে অনেক বিশ্লেষক এখন বলছেন, “রণবীর শুধু কামব্যাক করেননি, তিনি সরাসরি নম্বর ওয়ানের লড়াইয়ে ঢুকে পড়েছেন।”
কেন এত সফল হল ‘ধুরন্ধর’?
সিনেমা বিশ্লেষকদের মতে, ‘ধুরন্ধর’ ফ্র্যাঞ্চাইজির সাফল্যের পিছনে কয়েকটি বড় কারণ রয়েছে—
১. আন্তর্জাতিক মানের অ্যাকশন
ছবির অ্যাকশন দৃশ্যগুলি হলিউড স্টাইলের। বড় স্কেল, বাস্তবসম্মত স্টান্ট এবং ভিএফএক্স দর্শকদের আলাদা অভিজ্ঞতা দিয়েছে।
২. রণবীরের নতুন ইমেজ
আগে রণবীরকে মূলত এনার্জেটিক, রোম্যান্টিক বা কমেডি চরিত্রে দেখা যেত। কিন্তু এখানে তাঁকে দেখা গেছে ডার্ক, সিরিয়াস এবং স্টাইলিশ অ্যাকশন হিরো হিসেবে।
৩. শক্তিশালী মিউজিক ও ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর
ছবির গানগুলি চার্টবাস্টার হয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় রিলস ও শর্ট ভিডিওর মাধ্যমে গানগুলি ভাইরাল হয়ে যায়।
৪. বিশ্বব্যাপী মার্কেটিং
প্রযোজনা সংস্থা আন্তর্জাতিক স্তরে ছবির প্রচার চালায়। ফলে বিদেশি বাজার থেকেও বিপুল আয় আসে।
৫. দক্ষিণ ভারতীয় দর্শকদের সমর্থন
প্যান-ইন্ডিয়া রিলিজের কৌশল ছবিটিকে অনেক বড় সাফল্য এনে দিয়েছে।
রণবীরের অভিনয় নিয়ে প্রশংসার ঝড়
শুধু বক্স অফিস নয়, অভিনয়ের ক্ষেত্রেও ব্যাপক প্রশংসা পাচ্ছেন রণবীর।
অনেক সমালোচক মনে করছেন, ‘ধুরন্ধর’ ফ্র্যাঞ্চাইজি তাঁর কেরিয়ারের সেরা পারফরম্যান্সগুলির মধ্যে একটি। অ্যাকশন দৃশ্য থেকে আবেগঘন মুহূর্ত— সব ক্ষেত্রেই তিনি নিজের দক্ষতা প্রমাণ করেছেন।
সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেকে লিখছেন, “এটাই রণবীরের আসল রূপ।”
কেউ কেউ আবার বলছেন, “এই ফ্র্যাঞ্চাইজি তাঁর কেরিয়ারকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে।”
বলিউডে নতুন প্রতিযোগিতা
রণবীরের এই সাফল্যের পর বলিউডে প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হয়ে উঠেছে।
একদিকে শাহরুখ খান এখনও আন্তর্জাতিক বাজারে বিশাল নাম। অন্যদিকে Salman Khan, Hrithik Roshan, Allu Arjun এবং প্রভাসের মতো তারকারাও বড় বাজেটের ছবির প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
তাই আগামী কয়েক বছর ভারতীয় বক্স অফিসে সুপারস্টারদের মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা দেখা যেতে পারে।
৪০০০ কোটির লক্ষ্য?
বর্তমানে রণবীরের মোট পোস্ট-কোভিড আয় ৩৭৮৫ কোটির বেশি। ফলে এখন সবার নজর তাঁর আগামী ছবির দিকে।
চলচ্চিত্র মহলের ধারণা, পরবর্তী বড় রিলিজ যদি সফল হয়, তাহলে খুব সহজেই তিনি ৪০০০ কোটির ক্লাবে প্রবেশ করবেন।
এমনকি কেউ কেউ বলছেন, ভবিষ্যতে তিনি ৫০০০ কোটির রেকর্ডও ছুঁতে পারেন।
দর্শকদের আবেগের কেন্দ্রবিন্দুতে রণবীর
রণবীর সিং বরাবরই তাঁর অদ্ভুত এনার্জি, রঙিন ফ্যাশন এবং প্রাণবন্ত ব্যক্তিত্বের জন্য পরিচিত। কিন্তু গত কয়েক বছরে তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন, শুধুমাত্র স্টাইল নয়— অভিনয় এবং পরিশ্রম দিয়েও তিনি দর্শকদের মন জয় করতে পারেন।
‘ধুরন্ধর’ ফ্র্যাঞ্চাইজি সেই প্রমাণই আরও শক্তভাবে তুলে ধরেছে।
আজকের দিনে যখন বক্স অফিসে সফল হওয়া অত্যন্ত কঠিন, তখন ৩৭০০ কোটির মাইলফলক স্পর্শ করা নিঃসন্দেহে বিশাল অর্জন।
ভবিষ্যতের পরিকল্পনা কী?
ইন্ডাস্ট্রির অন্দরমহলে জোর গুঞ্জন, রণবীর এখন একাধিক বড় বাজেটের প্রজেক্ট নিয়ে আলোচনা করছেন। অ্যাকশন, থ্রিলার, ঐতিহাসিক নাটক— সব ধরনের ছবিতেই তাঁকে দেখা যেতে পারে।
এছাড়া ‘ধুরন্ধর ৩’ নিয়েও ইতিমধ্যে জল্পনা শুরু হয়েছে। যদিও নির্মাতারা এখনও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করেননি, তবে দর্শকদের উত্তেজনা তুঙ্গে।
বলিউডে প্রত্যাবর্তনের সেরা উদাহরণ
একসময় যাঁকে নিয়ে প্রশ্ন উঠছিল, আজ তিনিই নতুন রেকর্ডের মালিক। এটাই হয়তো একজন প্রকৃত তারকার পরিচয়।
রণবীর সিংয়ের যাত্রা দেখিয়ে দিল— ব্যর্থতা চিরস্থায়ী নয়। সঠিক গল্প, সঠিক সময় এবং কঠোর পরিশ্রম একজন অভিনেতাকে আবার শীর্ষে পৌঁছে দিতে পারে।
আর তাই বর্তমানে বলিউডের সবচেয়ে আলোচিত নামগুলির মধ্যে অন্যতম হয়ে উঠেছেন রণবীর। তাঁর ‘ধুরন্ধর’ ঝড় এখন শুধু ভারতেই নয়, গোটা বিশ্বের বক্স অফিসে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।



Post Comment