england vs croatia
স্পোর্টস এন্টারটেইনমেন্ট ডেস্ক | বিশ্বকাপ ২০২৬ বিশেষ প্রতিবেদন
ফুটবল বিশ্বকাপ মানেই আবেগ, নাটকীয়তা, চমক এবং সুপারস্টারদের উজ্জ্বল পারফরম্যান্স। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের গ্রুপ-এল ম্যাচে সেই সব উপাদান একসঙ্গে দেখা গেল ইংল্যান্ড ও ক্রোয়েশিয়ার লড়াইয়ে। ডালাস স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত এই উত্তেজনাপূর্ণ ম্যাচে ইংল্যান্ড ৪-২ গোলে পরাজিত করেছে ক্রোয়েশিয়াকে। ম্যাচজুড়ে ছিল আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণ, দুর্দান্ত গোল, অসাধারণ গোলরক্ষক প্রদর্শনী এবং শেষ পর্যন্ত হ্যারি কেনের নেতৃত্বে ইংল্যান্ডের দাপুটে জয়।
এই ম্যাচ শুধু তিন পয়েন্টের লড়াই ছিল না; এটি ছিল দুই ইউরোপীয় শক্তিধর দলের মর্যাদার লড়াই। একদিকে ইংল্যান্ডের তরুণ ও অভিজ্ঞতার মিশ্রণ, অন্যদিকে লুকা মদরিচের নেতৃত্বে ক্রোয়েশিয়ার লড়াকু মানসিকতা। শেষ পর্যন্ত কেন, বেলিংহ্যাম ও রাশফোর্ডদের উজ্জ্বল পারফরম্যান্সে জয় তুলে নেয় ইংল্যান্ড।
ম্যাচের সারসংক্ষেপ
ম্যাচ: ইংল্যান্ড বনাম ক্রোয়েশিয়া
প্রতিযোগিতা: ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬
গ্রুপ: গ্রুপ এল
ভেন্যু: ডালাস স্টেডিয়াম
ফলাফল: ইংল্যান্ড ৪-২ ক্রোয়েশিয়া
গোলদাতারা:
- ইংল্যান্ড: হ্যারি কেন (২), জুড বেলিংহ্যাম, মার্কাস রাশফোর্ড
- ক্রোয়েশিয়া: মার্টিন বাতুরিনা, পেতার মুসা
শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ইংল্যান্ড
ম্যাচের শুরু থেকেই ইংল্যান্ড আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে থাকে। ননি মাদুয়েকের গতি এবং ডান দিক দিয়ে ধারাবাহিক আক্রমণ ক্রোয়েশিয়ার রক্ষণকে ব্যস্ত রাখে।
প্রথম দিকে মাদুয়েককে বক্সের ভিতরে ফাউল করেন অভিজ্ঞ মিডফিল্ডার লুকা মদরিচ। রেফারি সঙ্গে সঙ্গে পেনাল্টির বাঁশি বাজান।
হ্যারি কেন স্পট কিক নিতে এগিয়ে আসেন। প্রথম শট গোল হলেও গোলরক্ষক ডোমিনিক লিভাকোভিচ লাইন ছেড়ে এগিয়ে আসায় পেনাল্টি পুনরায় নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। দ্বিতীয় সুযোগেও ভুল করেননি কেন। ইংল্যান্ড এগিয়ে যায় ১-০ ব্যবধানে।
ক্রোয়েশিয়ার দ্রুত প্রত্যাবর্তন
গোল হজম করার পর ক্রোয়েশিয়া ভেঙে পড়েনি। বরং আরও সংগঠিত ফুটবল খেলতে শুরু করে।
পেতার সুকিচের অসাধারণ পাস থেকে মার্টিন বাতুরিনা ইংল্যান্ডের ডিফেন্স ভেদ করে দুর্দান্ত শটে গোল করেন। গোলটি ছিল ম্যাচের অন্যতম সেরা মুহূর্ত।
স্কোরলাইন দাঁড়ায় ১-১।
এই গোলের সময় ইংল্যান্ডের ডিফেন্সে কিছুটা সমন্বয়হীনতা দেখা যায় এবং গোলরক্ষক জর্ডান পিকফোর্ডও পুরোপুরি আত্মবিশ্বাসী ছিলেন না।
বেলিংহ্যামের জাদুকরী মুহূর্ত
বিশ্ব ফুটবলে বর্তমানে সবচেয়ে আলোচিত মিডফিল্ডারদের একজন হলেন Jude Bellingham।
ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে এলিয়ট অ্যান্ডারসনের নিখুঁত পাস থেকে বল পান বেলিংহ্যাম। কয়েকজন ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে অসাধারণ ফিনিশিংয়ে বল জালে জড়ান তিনি।
এই গোল ইংল্যান্ডকে আবারও এগিয়ে দেয়।
বেলিংহ্যামের এই গোল দেখিয়ে দেয় কেন তাকে বর্তমান প্রজন্মের অন্যতম সেরা মিডফিল্ডার বলা হয়।
কেনের হেডে ইংল্যান্ডের তৃতীয় গোল
ইংল্যান্ডের তৃতীয় গোল আসে কর্নার থেকে।
ডেকলান রাইসের নিখুঁত কর্নার কিক হেড করে জালে পাঠান অধিনায়ক Harry Kane।
ক্রোয়েশিয়ার তরুণ ডিফেন্ডার লুকা ভুসকোভিচ কেনকে মার্ক করতে ব্যর্থ হন।
এই গোলের মাধ্যমে কেন বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের সর্বোচ্চ গোলদাতাদের তালিকায় নতুন রেকর্ড স্পর্শ করেন।
পেরিসিচের অভিজ্ঞতায় ফের লড়াইয়ে ক্রোয়েশিয়া
৩-১ পিছিয়ে পড়েও হাল ছাড়েনি ক্রোয়েশিয়া।
অভিজ্ঞ উইঙ্গার Ivan Perisic অসাধারণ হেড পাস দেন পেতার মুসাকে। তিনি ভলি শটে গোল করে ব্যবধান কমিয়ে আনেন।
স্কোর দাঁড়ায় ৩-২।
ম্যাচ তখন আবারও উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠে।
লিভাকোভিচের অবিশ্বাস্য সেভ
যদিও ক্রোয়েশিয়া চার গোল খেয়েছে, তবুও ম্যাচের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় ছিলেন Dominik Livakovic।
তিনি একের পর এক নিশ্চিত গোল বাঁচিয়ে দেন।
- কেনের শট
- স্পেন্সের সুযোগ
- বেলিংহ্যামের আক্রমণ
- সাকার তৈরি সুযোগ
সব মিলিয়ে অন্তত পাঁচটি অসাধারণ সেভ করেন তিনি।
লিভাকোভিচ না থাকলে ব্যবধান আরও বড় হতে পারত।
রাশফোর্ডের গোলেই ম্যাচের ইতি
ম্যাচের শেষভাগে বদলি হিসেবে মাঠে নামেন Marcus Rashford।
বুকায়ো সাকা এবং মরগান রজার্সের দারুণ সমন্বয়ে বল পান রাশফোর্ড।
তার শক্তিশালী শট লিভাকোভিচকেও পরাস্ত করে।
এই গোলেই ইংল্যান্ড ৪-২ ব্যবধানে জয় নিশ্চিত করে।
ইংল্যান্ডের খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স বিশ্লেষণ
হ্যারি কেন – ৯/১০
দুই গোল করেছেন। আক্রমণে নেতৃত্ব দিয়েছেন। পাসিং ও ফিনিশিং ছিল দুর্দান্ত।
এলিয়ট অ্যান্ডারসন – ৮/১০
মিডফিল্ডে অসাধারণ নিয়ন্ত্রণ দেখিয়েছেন। বেলিংহ্যামের গোলে বড় অবদান।
ননি মাদুয়েকে – ৮/১০
পেনাল্টি আদায় করেছেন এবং পুরো ম্যাচে ক্রোয়েশিয়ার ডিফেন্সকে চাপে রেখেছেন।
জুড বেলিংহ্যাম – ৭/১০
একটি দারুণ গোল করেছেন। মাঝমাঠে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।
ডেকলান রাইস – ৭/১০
কর্নার থেকে অ্যাসিস্ট। তবে সাধারণ মানের তুলনায় কিছুটা ক্লান্ত দেখিয়েছে।
ক্রোয়েশিয়ার পারফরম্যান্স বিশ্লেষণ
ডোমিনিক লিভাকোভিচ – ৯/১০
ম্যাচের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়।
মার্টিন বাতুরিনা – ৭/১০
গোল করেছেন এবং ইংল্যান্ডের ডিফেন্সকে সমস্যায় ফেলেছেন।
পেতার মুসা – ৭/১০
দারুণ ভলি গোল করেছেন।
লুকা মদরিচ – ৭/১০
পেনাল্টি দিলেও অভিজ্ঞতার ছাপ রেখেছেন।
ইভান পেরিসিচ – ৭/১০
৩৭ বছর বয়সেও অসাধারণ এনার্জি দেখিয়েছেন।
ম্যাচের টার্নিং পয়েন্ট
১. মাদুয়েকের আদায় করা পেনাল্টি
২. বেলিংহ্যামের ব্যক্তিগত নৈপুণ্যে গোল
৩. কেনের হেড
৪. লিভাকোভিচের একাধিক সেভ
৫. রাশফোর্ডের শেষ গোল
ইংল্যান্ডের শক্তির জায়গা
- আক্রমণভাগে গভীরতা
- বেঞ্চ শক্তি
- দ্রুত কাউন্টার অ্যাটাক
- সেট পিস দক্ষতা
- তরুণ ও অভিজ্ঞদের ভারসাম্য
ক্রোয়েশিয়ার ইতিবাচক দিক
পরাজয় সত্ত্বেও ক্রোয়েশিয়া দেখিয়েছে তারা এখনও বড় দল।
- মদরিচের নেতৃত্ব
- বাতুরিনার সৃজনশীলতা
- পেরিসিচের অভিজ্ঞতা
- লিভাকোভিচের গোলকিপিং
এই বিষয়গুলো ভবিষ্যৎ ম্যাচে তাদের আত্মবিশ্বাস দেবে।
বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বার্তা
এই জয়ের মাধ্যমে ইংল্যান্ড স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে তারা ২০২৬ বিশ্বকাপ জয়ের অন্যতম দাবিদার।
হ্যারি কেনের নেতৃত্ব, বেলিংহ্যামের সৃজনশীলতা, রাইসের নিয়ন্ত্রণ এবং রাশফোর্ড-সাকার গতিময়তা দলটিকে ভয়ংকর প্রতিপক্ষ বানিয়েছে।
বিশ্বকাপের দীর্ঘ যাত্রায় আরও কঠিন প্রতিপক্ষ অপেক্ষা করছে, তবে ক্রোয়েশিয়ার বিরুদ্ধে এই ৪-২ জয় ইংল্যান্ডের আত্মবিশ্বাসকে কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
ডালাসের রাত তাই স্মরণীয় হয়ে থাকবে হ্যারি কেনের গোল, বেলিংহ্যামের জাদু এবং বিশ্বকাপের আরেকটি রোমাঞ্চকর ফুটবল মহাকাব্যের জন্য।
