গুগলের ৩ কোটি ২০ লক্ষ মশার বাহিনী! মশার বিরুদ্ধেই নামছে মশা
মশা মারতে মশা! গুগলের অভিনব পরিকল্পনা
মশার উপদ্রব কমানোর কথা উঠলে সাধারণত কীটনাশক, মশারি বা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কথাই মনে আসে। কিন্তু এবার প্রযুক্তি জগতের অন্যতম বৃহৎ প্রতিষ্ঠান Google এমন এক পরিকল্পনা নিয়ে এসেছে যা শুনলে অবাক হতে হয়।
সংস্থাটি যুক্তরাষ্ট্রের কিছু এলাকায় পরীক্ষামূলকভাবে প্রায় ৩ কোটি ২০ লক্ষ বিশেষভাবে প্রস্তুতকৃত পুরুষ মশা ছাড়ার অনুমতি চেয়েছে। উদ্দেশ্য একটাই—মশার সংখ্যা কমিয়ে ডেঙ্গু, জিকা, চিকুনগুনিয়া ও অন্যান্য মশাবাহিত রোগের ঝুঁকি হ্রাস করা।
কী এই ‘ডিবাগ’ প্রকল্প?
গুগলের গবেষণা উদ্যোগ Debug Project ২০১৪ সাল থেকে মশাবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণের নতুন প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে।
গবেষকদের মতে, পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ প্রতি বছর মশাবাহিত রোগে আক্রান্ত হন। প্রচলিত রাসায়নিক কীটনাশক অনেক ক্ষেত্রে পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। তাই বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে বিকল্প ও পরিবেশবান্ধব সমাধান খুঁজছেন।
কীভাবে কাজ করবে এই প্রযুক্তি?
এই প্রকল্পে গবেষকরা বিশেষ ধরনের ব্যাকটেরিয়া ব্যবহার করবেন, যার নাম Wolbachia pipientis।
ল্যাবরেটরিতে তৈরি পুরুষ মশার শরীরে এই ব্যাকটেরিয়া প্রবেশ করানো হবে। এরপর সেই মশাগুলোকে প্রকৃতিতে ছেড়ে দেওয়া হবে।
যখন এই পুরুষ মশা স্বাভাবিক স্ত্রী মশার সঙ্গে মিলিত হবে, তখন উৎপন্ন ডিম থেকে নতুন মশা জন্মাবে না। ফলে ধীরে ধীরে ওই অঞ্চলে মশার সংখ্যা কমতে শুরু করবে।
মানুষকে কি বেশি মশার কামড় খেতে হবে?
এই প্রশ্নটাই সবচেয়ে বেশি উঠছে।
বিজ্ঞানীদের উত্তর হলো—না।
কারণ শুধুমাত্র স্ত্রী মশাই রক্ত খায় এবং মানুষকে কামড়ায়। পরীক্ষায় ব্যবহৃত মশাগুলো হবে পুরুষ মশা, যারা মানুষকে কামড়ায় না।
তাই লক্ষ লক্ষ মশা ছাড়া হলেও মানুষের কামড় খাওয়ার ঝুঁকি বাড়বে না বলে গবেষকদের দাবি।
কত মশা ছাড়া হবে?
পরিকল্পনা অনুযায়ী—
- প্রথম বছরে ১ কোটি ৬০ লক্ষ মশা ছাড়া হবে।
- দ্বিতীয় বছরে আরও ১ কোটি ৬০ লক্ষ মশা ছাড়া হবে।
অর্থাৎ দুই বছরে মোট ৩ কোটি ২০ লক্ষ মশা ব্যবহার করা হবে এই পরীক্ষায়।
কোথায় হবে পরীক্ষা?
প্রস্তাব অনুযায়ী পরীক্ষাটি যুক্তরাষ্ট্রের কিছু অঞ্চলে পরিচালিত হতে পারে, বিশেষ করে এমন এলাকায় যেখানে মশাবাহিত রোগের ঝুঁকি বেশি।
তবে ঠিক কোন শহর বা এলাকায় প্রকল্পটি শুরু হবে, সে বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত ঘোষণা করা হয়নি।
বর্তমানে সংশ্লিষ্ট সরকারি পরিবেশ সংস্থাগুলি বিষয়টি পর্যালোচনা করছে।
এটি কি সম্পূর্ণ নতুন ধারণা?
আসলে না।
বিজ্ঞানীরা বহু বছর ধরেই জীবাণুমুক্ত বা প্রজনন অক্ষম পোকামাকড় ব্যবহার করে কীটপতঙ্গ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে আসছেন।
এর আগে—
- ফলের মাছি নিয়ন্ত্রণে
- গবাদিপশুর ক্ষতিকর পোকা দমনে
- কৃষিক্ষেত্রের বিভিন্ন কীটপতঙ্গ নিয়ন্ত্রণে
এই ধরনের কৌশল ব্যবহার করা হয়েছে।
তবে গুগলের প্রকল্পটি প্রযুক্তিগতভাবে অনেক বড় পরিসরে পরিচালিত হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
পরিবেশের জন্য কতটা নিরাপদ?
এ নিয়ে বিজ্ঞানী মহলে আলোচনা চলছে।
সমর্থকদের মতে—
✅ রাসায়নিক কীটনাশকের ব্যবহার কমবে।
✅ পরিবেশ দূষণ কম হবে।
✅ মশাবাহিত রোগের বিস্তার কমতে পারে।
অন্যদিকে কিছু গবেষক মনে করছেন, বড় আকারে এমন পরীক্ষা চালানোর আগে স্থানীয় জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশগত প্রভাব গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা জরুরি।
ডেঙ্গু ও জিকার বিরুদ্ধে নতুন অস্ত্র?
বিশ্ব স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু, জিকা ও চিকুনগুনিয়ার মতো রোগ বিশ্বজুড়ে উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।
জলবায়ু পরিবর্তন, নগরায়ন এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে অনেক অঞ্চলে মশার বিস্তার বাড়ছে।
এই পরিস্থিতিতে প্রযুক্তিনির্ভর মশা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ভবিষ্যতে জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
ভবিষ্যৎ কী বলছে?
যদি পরীক্ষাটি সফল হয়, তাহলে ভবিষ্যতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে একই ধরনের প্রকল্প চালু হতে পারে।
বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জেনেটিক গবেষণা এবং জীববিজ্ঞানের সমন্বয়ে আগামী দিনে রোগ নিয়ন্ত্রণের আরও উন্নত পদ্ধতি তৈরি হবে।
মশা দমনে মশা ব্যবহার করার ধারণা শুনতে অদ্ভুত লাগলেও এর পেছনে রয়েছে আধুনিক বিজ্ঞান ও দীর্ঘ গবেষণা। গুগলের এই উদ্যোগ সফল হলে ডেঙ্গু, জিকা ও অন্যান্য মশাবাহিত রোগের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এটি নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে। তবে প্রকল্পটির বাস্তব ফলাফল জানতে গবেষণা ও পরীক্ষার ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করতেই হবে।

