kolkata knight riders vs royal challengers bengaluru match scorecard
বিরাট কোহলির ঐতিহাসিক রাত! টি-টোয়েন্টিতে ১৪ হাজার রান, আইপিএলে নতুন বিশ্বরেকর্ডে ক্রিকেট দুনিয়ায় তোলপাড়
ভারতীয় ক্রিকেটের পোস্টার বয় Virat Kohli আবারও প্রমাণ করে দিলেন কেন তাঁকে আধুনিক ক্রিকেটের ‘রান মেশিন’ বলা হয়। আইপিএল ২০২৬-এর এক হাইভোল্টেজ ম্যাচে Royal Challengers Bengaluru-র হয়ে Kolkata Knight Riders-এর বিরুদ্ধে দুর্ধর্ষ অপরাজিত ১০৫ রান করে শুধু দলকে জেতাননি, একের পর এক রেকর্ড গড়ে ইতিহাসের পাতায় নিজের নাম আরও গাঢ় অক্ষরে লিখে ফেললেন কিং কোহলি।
রায়পুরের মাঠে সেই ইনিংস ছিল যেন ক্রিকেট শিল্পের এক অপূর্ব প্রদর্শনী। মাঠে উপস্থিত হাজার হাজার দর্শক থেকে শুরু করে টিভির সামনে বসে থাকা কোটি কোটি ক্রিকেটপ্রেমী— সকলেই দেখলেন কীভাবে একজন কিংবদন্তি খারাপ সময় কাটিয়ে আবারও রাজকীয় প্রত্যাবর্তন করতে পারেন। মাত্র কয়েকদিন আগেই টানা দুই ম্যাচে শূন্য রানে আউট হয়েছিলেন কোহলি। সমালোচকেরা প্রশ্ন তুলছিলেন তাঁর ফর্ম নিয়ে। কিন্তু বড় খেলোয়াড়রা যে চাপের মুহূর্তেই নিজেদের সেরাটা দেন, সেটাই যেন ফের একবার দেখালেন তিনি।
টানা দুই ডাকের পর শতরান, বিরল কীর্তি কোহলির
আইপিএলের ইতিহাসে আগে কখনও এমন ঘটনা ঘটেনি। টানা দুই ম্যাচে ডাক মারার পর পরবর্তী ম্যাচেই শতরান! এই অসম্ভবকে সম্ভব করলেন বিরাট কোহলি। এর আগে আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি মিলিয়ে মাত্র পাঁচজন ব্যাটার এই নজির গড়তে পেরেছিলেন। সেই তালিকায় ছিলেন David Warner, Rohit Sharma, Sanju Samson-দের মতো তারকারা। এবার সেই তালিকায় ঢুকে পড়লেন কোহলি।
এই শতরান শুধু সংখ্যার হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ নয়, মানসিক দৃঢ়তারও বড় উদাহরণ। কারণ একজন ব্যাটার যখন ধারাবাহিকভাবে ব্যর্থ হন, তখন তাঁর উপর চাপ কয়েকগুণ বেড়ে যায়। কিন্তু কোহলি শুরু থেকেই আত্মবিশ্বাসী ছিলেন। প্রথম কয়েক ওভারে ধৈর্য ধরে খেলেন, তারপর ধীরে ধীরে গতি বাড়ান। শেষ পর্যন্ত ১০৫ রানে অপরাজিত থেকে দলকে স্মরণীয় জয় এনে দেন।
টি-টোয়েন্টিতে ১০টি শতরান, ভারতের প্রথম ব্যাটার
এই ম্যাচে শতরান করে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে নিজের ১০ম সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন কোহলি। এর মাধ্যমে তিনি ভারতের প্রথম ব্যাটার হিসেবে এই কৃতিত্ব অর্জন করলেন। বিশ্ব ক্রিকেটে এখন তাঁর উপরে রয়েছেন মাত্র তিনজন— Chris Gayle, Babar Azam এবং ডেভিড ওয়ার্নার।
টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে শতরান করা সবসময়ই কঠিন। কারণ এখানে সময় কম, ঝুঁকি বেশি। সেখানে ধারাবাহিকভাবে এত শতরান করা যে কত বড় ব্যাপার, তা ক্রিকেটবিশেষজ্ঞদের বক্তব্যেই পরিষ্কার। অনেকের মতে, কোহলির এই রেকর্ড আগামী বহু বছর অটুট থাকতে পারে।
১৪ হাজার টি-টোয়েন্টি রান, সবচেয়ে দ্রুত কোহলি
এই ম্যাচে আরেকটি মহারেকর্ড গড়েছেন কোহলি। তিনি টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে ১৪ হাজার রান পূর্ণ করেছেন। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হল, মাত্র ৪০৯ ইনিংসে এই মাইলফলকে পৌঁছেছেন তিনি। এর আগে দ্রুততম ছিলেন ক্রিস গেইল, যিনি ৪২৩ ইনিংস নিয়েছিলেন।
14000 \div 409 \approx 34.23
অর্থাৎ প্রতি ইনিংসে গড়ে ৩৪-এরও বেশি রান করে এগিয়েছেন কোহলি। টি-টোয়েন্টির মতো ঝুঁকিপূর্ণ ফরম্যাটে এই গড় সত্যিই অবিশ্বাস্য। ভারতের প্রথম ব্যাটার হিসেবে এই কীর্তি গড়ে তিনি আরও একবার নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করলেন।
আইপিএলে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলার রেকর্ড
এই ম্যাচ ছিল কোহলির আইপিএল কেরিয়ারের ২৭৯তম ম্যাচ। এর ফলে তিনি টপকে গেলেন মহেন্দ্র সিং ধোনি ও রোহিত শর্মাকে। ধোনি এবং রোহিত দুজনেই ২৭৮টি করে ম্যাচ খেলেছিলেন।
MS Dhoni দীর্ঘদিন আইপিএলের সবচেয়ে অভিজ্ঞ ক্রিকেটারদের একজন হিসেবে পরিচিত ছিলেন। অন্যদিকে Rohit Sharma-ও আইপিএলে একাধিক ট্রফি জেতা অধিনায়ক। সেই দুই কিংবদন্তিকে পিছনে ফেলে নতুন ইতিহাস গড়লেন কোহলি।
আইপিএলে ৯টি শতরান, অন্যদের থেকে অনেক এগিয়ে
আইপিএলে এখন কোহলির শতরানের সংখ্যা ৯। দ্বিতীয় স্থানে থাকা Jos Buttler-এর শতরান সংখ্যা ৭। অর্থাৎ কোহলি অনেকটাই এগিয়ে।
সবচেয়ে বড় বিষয় হল, এই ৯টি শতরানের মধ্যে ৩টি এসেছে রান তাড়া করতে নেমে। চাপের ম্যাচে দলের জন্য শতরান করা যে কতটা কঠিন, তা ক্রিকেটভক্তরা ভালোই জানেন। সেই কারণেই কোহলির এই কীর্তিকে আরও বেশি মূল্য দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
মিডউইকেট অঞ্চলে বিধ্বংসী কোহলি
এই ইনিংসে কোহলি মিডউইকেট অঞ্চলে ৪৬ রান করেন। ESPNcricinfo-র তথ্য অনুযায়ী, টি-টোয়েন্টি ক্যারিয়ারে কোনও এক ইনিংসে ওই অঞ্চলে এত রান আগে কখনও করেননি তিনি।
এদিন কোহলির ব্যাটিংয়ে সবচেয়ে আকর্ষণীয় ছিল তাঁর টাইমিং। ফ্লিক, পুল, পিক-আপ শট— সবকিছু যেন নিখুঁতভাবে ব্যাটের মাঝখানে লেগেছে। বিশেষ করে স্পিনারদের বিরুদ্ধে তাঁর ফুটওয়ার্ক ছিল অসাধারণ।
দেবদত্ত পাডিক্কালের সঙ্গে দুর্দান্ত জুটি
Devdutt Padikkal-এর সঙ্গে কোহলির বোঝাপড়া এদিনও ছিল দারুণ। সফল রান তাড়ায় এই জুটির ৫০-এর বেশি রানের পার্টনারশিপের সংখ্যা এখন ১০, যা আইপিএলের ইতিহাসে সর্বাধিক।
দুজন মিলে সফল রান তাড়ায় ইতিমধ্যে ১০৩৫ রান করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে চারটি শতরানের জুটি। ক্রিকেটবিশেষজ্ঞদের মতে, এই জুটি আগামী দিনে আরও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতে পারে।
রায়পুরে কোহলির রাজত্ব
রায়পুরে অনুষ্ঠিত ৩৩টি পুরুষদের টি-টোয়েন্টি ম্যাচের মধ্যে কোহলির ১০৫* এখন সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত স্কোর। এর আগে এখানে একমাত্র শতরান ছিল Kane Williamson-এর।
এই মাঠে ব্যাটিং করা খুব সহজ নয়। পিচ মাঝে মাঝে ধীর হয়ে যায়, বল ব্যাটে ঠিকমতো আসে না। কিন্তু কোহলি শুরু থেকেই পরিস্থিতি বুঝে খেলেন। প্রথমে স্ট্রাইক রোটেট করেন, পরে বাউন্ডারির ঝড় তোলেন।
প্লেয়ার অফ দ্য ম্যাচেও নতুন নজির
আইপিএলে কোহলির প্লেয়ার অফ দ্য ম্যাচ পুরস্কারের সংখ্যা এখন ২১। ভারতীয়দের মধ্যে তিনি যৌথভাবে শীর্ষে রয়েছেন রোহিত শর্মার সঙ্গে।
সবমিলিয়ে তাঁর উপরে রয়েছেন কেবল AB de Villiers এবং ক্রিস গেইল। আরবিডির ২৫টি এবং গেইলের ২২টি পুরস্কার রয়েছে।
সমালোচনার জবাব ব্যাটে
গত কয়েক ম্যাচে কোহলির স্ট্রাইক রেট এবং ফর্ম নিয়ে নানা সমালোচনা হচ্ছিল। সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেকেই বলছিলেন, তিনি নাকি আগের মতো আর আগ্রাসী নন। কিন্তু কেকেআরের বিরুদ্ধে তাঁর ইনিংস যেন সেই সব সমালোচনার একেবারে উপযুক্ত জবাব।
প্রথম ২০ বলে ধীরে শুরু করলেও পরে ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠেন তিনি। বিশেষ করে ডেথ ওভারে তাঁর শট নির্বাচন ছিল অসাধারণ। কভার ড্রাইভ, পুল, অন-ড্রাইভ— প্রতিটি শটেই ছিল ক্লাস এবং শক্তির নিখুঁত মিশ্রণ।
আরসিবির প্লে-অফ স্বপ্ন আরও উজ্জ্বল
এই জয়ের ফলে Royal Challengers Bengaluru পয়েন্ট টেবিলের শীর্ষে উঠে এসেছে। দলের নেট রানরেটও অনেকটাই উন্নত হয়েছে। কোহলির এই ইনিংস শুধু ব্যক্তিগত রেকর্ড নয়, দলের আত্মবিশ্বাসও কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
আরসিবি সমর্থকেরা বহু বছর ধরে আইপিএল ট্রফির অপেক্ষায়। প্রতি মরশুমেই দল ভালো শুরু করলেও শেষ পর্যন্ত হতাশ হতে হয়েছে। তবে এবার পরিস্থিতি কিছুটা আলাদা। কোহলি ফর্মে ফিরেছেন, মিডল অর্ডারও স্থির দেখাচ্ছে, বোলিং ইউনিটও আগের তুলনায় শক্তিশালী।
ক্রিকেটবিশ্বে কোহলির প্রভাব
বিরাট কোহলি শুধুই একজন ক্রিকেটার নন, তিনি এক আবেগ। তাঁর ব্যাটিং দেখতে মাঠে আসেন হাজার হাজার মানুষ। সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁর প্রতিটি ইনিংস নিয়ে আলোচনা হয় বিশ্বজুড়ে।
Indian Premier League-এর জনপ্রিয়তা বাড়ানোর পিছনেও কোহলির বিশাল ভূমিকা রয়েছে। তরুণ ক্রিকেটারদের কাছে তিনি অনুপ্রেরণা। ফিটনেস, মানসিক দৃঢ়তা, ম্যাচের প্রতি নিবেদন— সবকিছুতেই তিনি আলাদা।
সামনে আরও বড় রেকর্ড?
ক্রিকেটবিশেষজ্ঞদের মতে, কোহলির সামনে এখন আরও বহু রেকর্ড অপেক্ষা করছে। টি-টোয়েন্টিতে সর্বাধিক রান, আইপিএলে আরও শতরান, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নতুন মাইলফলক— সবকিছুই তাঁর নাগালের মধ্যে।
৩৭ বছর বয়সের কাছাকাছি পৌঁছেও যেভাবে তিনি ফিটনেস ধরে রেখেছেন, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। তাঁর ব্যাটিং দেখে মনে হচ্ছে, এখনও বহু বছর ক্রিকেট বিশ্বকে শাসন করতে পারেন তিনি।
ভক্তদের আবেগে ভাসছে সোশ্যাল মিডিয়া
কোহলির শতরানের পর সোশ্যাল মিডিয়ায় যেন ঝড় বয়ে যায়। “King is Back”, “GOAT Kohli”, “Chase Master Forever”— এমন অসংখ্য পোস্টে ভরে যায় ইন্টারনেট।
ভারতের বিভিন্ন শহরে আরসিবি সমর্থকেরা উদযাপন শুরু করেন। অনেক জায়গায় আতসবাজিও পোড়ানো হয়। ক্রিকেটপ্রেমীদের মতে, কোহলির এই ইনিংস শুধু একটি শতরান নয়, এটি ছিল এক আবেগের প্রত্যাবর্তন।
ক্রিকেট ইতিহাসে এমন কিছু রাত থাকে, যা বছরের পর বছর মনে রাখা হয়। কেকেআরের বিরুদ্ধে বিরাট কোহলির ১০৫* ঠিক তেমনই এক রাত। টানা দুই ডাকের পর শতরান, টি-টোয়েন্টিতে ১৪ হাজার রান, আইপিএলে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ, ভারতের প্রথম ব্যাটার হিসেবে ১০টি টি-টোয়েন্টি শতরান— এক ম্যাচেই যেন রেকর্ডের পাহাড় গড়ে ফেললেন কিং কোহলি।
সমালোচনা, চাপ, প্রত্যাশা— সবকিছুকে হার মানিয়ে আবারও তিনি প্রমাণ করলেন, বড় মঞ্চের সবচেয়ে বড় তারকা এখনও তিনিই। ক্রিকেট বিশ্ব হয়তো আরও বহু কিংবদন্তি দেখবে, কিন্তু বিরাট কোহলির মতো আবেগ, আগ্রাসন এবং ধারাবাহিকতা একসঙ্গে পাওয়া সত্যিই বিরল।
