Petrol, disel price today
আন্তর্জাতিক বাজারে অশান্তি, পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং অপরিশোধিত তেলের দামের লাগাতার ওঠানামার মধ্যেই বড় ধাক্কা খেল দেশের সাধারণ মানুষ। শুক্রবার থেকে ফের বেড়ে গেল পেট্রল ও ডিজ়েলের দাম। কেন্দ্রের ঘোষণার পর থেকেই দেশের চার মহানগরে নতুন দামে জ্বালানি বিক্রি শুরু হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরেই আশঙ্কা করা হচ্ছিল, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির জেরে ভারতেও জ্বালানির দাম বাড়তে পারে। অবশেষে সেই আশঙ্কাই সত্যি হলো।
কলকাতা, দিল্লি, মুম্বই ও চেন্নাই— দেশের প্রধান শহরগুলিতে পেট্রল ও ডিজ়েলের দাম লিটার প্রতি ৩ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। এর ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও আগামী দিনে বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা অর্থনীতিবিদদের একাংশের। কারণ জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পড়ে পরিবহণ খরচের উপর, আর পরিবহণ ব্যয় বাড়লেই বাজারে নিত্যপণ্যের দামও ঊর্ধ্বমুখী হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরান-ইজরায়েল সংঘাত এবং পশ্চিম এশিয়ার উত্তেজনা আন্তর্জাতিক অপরিশোধিত তেলের বাজারে অস্থিরতা তৈরি করেছে। ভারত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল আমদানিকারক দেশ হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে সামান্য পরিবর্তনের প্রভাবও দেশের বাজারে পড়ে।
কোথায় কত হলো নতুন দাম?
নতুন মূল্যবৃদ্ধির ফলে দেশের বিভিন্ন মহানগরে পেট্রল ও ডিজ়েলের দাম নিম্নরূপ হয়েছে—
পেট্রলের নতুন দাম
- কলকাতা – ১০৮.৭৪ টাকা প্রতি লিটার
- দিল্লি – ৯৭.৭৭ টাকা প্রতি লিটার
- মুম্বই – ১০৬.৬৮ টাকা প্রতি লিটার
- চেন্নাই – ১০৩.৬৭ টাকা প্রতি লিটার
ডিজ়েলের নতুন দাম
- কলকাতা – ৯৫.১৩ টাকা প্রতি লিটার
- দিল্লি – ৯০.৬৭ টাকা প্রতি লিটার
- মুম্বই – ৯৩.১৪ টাকা প্রতি লিটার
- চেন্নাই – ৯৫.২৫ টাকা প্রতি লিটার
এই মূল্যবৃদ্ধির ফলে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়বেন প্রতিদিন যাঁরা ব্যক্তিগত গাড়ি বা মোটরবাইক ব্যবহার করেন। একই সঙ্গে ট্রাক, বাস ও পণ্যবাহী গাড়ির খরচও বাড়বে। তার প্রভাব পড়বে বাজারে সবজি থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর দামে।
কেন বাড়ল পেট্রল-ডিজ়েলের দাম?
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মূল্যবৃদ্ধির পিছনে একাধিক কারণ রয়েছে। তার মধ্যে সবচেয়ে বড় কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বৃদ্ধি। ইরানকে কেন্দ্র করে পশ্চিম এশিয়ায় যে যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তাতে বিশ্বজুড়ে তেল সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
পশ্চিম এশিয়া বা মধ্যপ্রাচ্য বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল উৎপাদনকারী অঞ্চল। সেই অঞ্চলে যুদ্ধ বা রাজনৈতিক সংঘাত শুরু হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বাড়তে থাকে। বর্তমানে ব্রেন্ট ক্রুডের দামও ঊর্ধ্বমুখী।
ভারতীয় রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্কের গভর্নরও সম্প্রতি সতর্ক করেছিলেন যে, পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে দেশে জ্বালানির দাম আরও বাড়তে পারে। বিরোধী দলগুলিও আগেই আশঙ্কা প্রকাশ করেছিল যে, রান্নার গ্যাসের পর এবার পেট্রল ও ডিজ়েলের দাম বাড়তে চলেছে।
প্রধানমন্ত্রী জ্বালানি সাশ্রয়ের আবেদন করেছিলেন
মূল্যবৃদ্ধির ঠিক আগের দিনই দেশবাসীর কাছে জ্বালানি সাশ্রয়ের আবেদন করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী Narendra Modi। তিনি বলেন, অপ্রয়োজনীয় জ্বালানি ব্যবহার কমাতে হবে এবং শক্তি সঞ্চয়ের উপর জোর দিতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারের এই আবেদন থেকেই অনেকেই বুঝতে শুরু করেছিলেন যে সামনে বড়সড় মূল্যবৃদ্ধি আসতে পারে। কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে চাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সরকারও জ্বালানি ব্যবহারে সংযমের বার্তা দিতে শুরু করেছিল।
ভারত কোথা থেকে আমদানি করে অপরিশোধিত তেল?
ভারত নিজের চাহিদার প্রায় ৮৫ শতাংশেরও বেশি অপরিশোধিত তেল বিদেশ থেকে আমদানি করে। দেশের অভ্যন্তরে যে পরিমাণ তেল উৎপাদন হয়, তা দেশের মোট চাহিদা পূরণ করার জন্য যথেষ্ট নয়। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারের উপর ভারতের নির্ভরতা অত্যন্ত বেশি।
বর্তমানে ভারত প্রধানত নিম্নলিখিত দেশগুলি থেকে অপরিশোধিত তেল আমদানি করে—
১. রাশিয়া
গত কয়েক বছরে ভারতের সবচেয়ে বড় তেল সরবরাহকারী দেশ হয়ে উঠেছে Russia। ইউক্রেন যুদ্ধের পর পশ্চিমী দেশগুলির নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়া তুলনামূলক কম দামে তেল বিক্রি করতে শুরু করে। সেই সুযোগে ভারত বিপুল পরিমাণ রুশ তেল আমদানি বাড়ায়।
২. ইরাক
Iraq বহু বছর ধরেই ভারতের অন্যতম বড় তেল সরবরাহকারী দেশ। মধ্যপ্রাচ্যের এই দেশটি থেকে ভারত নিয়মিত অপরিশোধিত তেল আমদানি করে থাকে।
৩. সৌদি আরব
Saudi Arabia ভারতের জ্বালানি বাজারে দীর্ঘদিনের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল উৎপাদক দেশ হওয়ায় ভারতের সঙ্গে সৌদি আরবের তেল বাণিজ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
৪. সংযুক্ত আরব আমিরশাহী
United Arab Emirates থেকেও ভারত উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অপরিশোধিত তেল আমদানি করে। বিশেষ করে আবুধাবির তেল ভারতের বিভিন্ন রিফাইনারিতে ব্যবহৃত হয়।
৫. যুক্তরাষ্ট্র
United States থেকেও সাম্প্রতিক সময়ে ভারত তেল আমদানি বাড়িয়েছে। শেল অয়েল উৎপাদন বৃদ্ধির ফলে মার্কিন তেল আন্তর্জাতিক বাজারে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
৬. কুয়েত ও নাইজেরিয়া
Kuwait এবং Nigeria থেকেও ভারত তেল আমদানি করে থাকে। আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি অনুযায়ী বিভিন্ন সময়ে আমদানির পরিমাণ পরিবর্তিত হয়।
কেন মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ?
ভারতের তেলের বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসে। ফলে সেখানে যুদ্ধ বা অস্থিরতা তৈরি হলেই ভারতীয় বাজারে তার প্রভাব পড়ে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি ইরান ঘিরে সংঘাত আরও বাড়ে, তাহলে হরমুজ প্রণালীতেও প্রভাব পড়তে পারে।
হরমুজ প্রণালী বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহণ রুট। প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল এই পথ দিয়ে বিশ্ববাজারে পৌঁছায়। এই রুটে সমস্যা তৈরি হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আরও বেড়ে যেতে পারে।
পাম্পে কেন দেখা দিয়েছিল আতঙ্ক?
গত কয়েক সপ্তাহে দেশের বিভিন্ন জায়গায় পেট্রল পাম্পে দীর্ঘ লাইন দেখা গিয়েছিল। কোথাও কোথাও সীমিত পরিমাণ জ্বালানি দেওয়ার অভিযোগও ওঠে। অনেক সাধারণ মানুষের মধ্যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল যে দেশে জ্বালানি সঙ্কট দেখা দিতে পারে।
যদিও কেন্দ্রের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল যে দেশের তেল ভাণ্ডারে পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে এবং আতঙ্কিত হওয়ার কোনও কারণ নেই। তবুও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ থেকেই যায়।
পরিবহণ খরচ বাড়লে কী প্রভাব পড়বে?
পেট্রল ও ডিজ়েলের দাম বাড়ার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে পরিবহণ ক্ষেত্রে। ট্রাক, বাস, ট্যাক্সি, অটো, অ্যাপ ক্যাব— সব ক্ষেত্রেই জ্বালানি প্রধান খরচ। ফলে জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহণ ভাড়াও বাড়তে পারে।
এর ফলে—
- বাজারে সবজি ও খাদ্যপণ্যের দাম বাড়তে পারে
- অনলাইন ডেলিভারি চার্জ বাড়তে পারে
- বাস ও ট্রাক ভাড়া বাড়তে পারে
- ছোট ব্যবসায়ীদের খরচ বাড়বে
- কৃষিক্ষেত্রেও প্রভাব পড়তে পারে
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিজ়েলের দাম বাড়া কৃষিক্ষেত্রের জন্য বিশেষভাবে উদ্বেগের। কারণ সেচের পাম্প, ট্র্যাক্টর ও পণ্য পরিবহণে ডিজ়েলের ব্যাপক ব্যবহার হয়।
সাধারণ মানুষের উপর কতটা চাপ বাড়বে?
মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারগুলির মাসিক খরচে এর সরাসরি প্রভাব পড়বে। প্রতিদিন অফিস যাতায়াত বা ব্যবসার কাজে যারা বাইক বা গাড়ি ব্যবহার করেন, তাঁদের মাসিক জ্বালানি খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, যদি কেউ মাসে ৫০ লিটার পেট্রল ব্যবহার করেন, তাহলে লিটার প্রতি ৩ টাকা বৃদ্ধিতে তাঁর মাসিক খরচ ১৫০ টাকা পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। একইভাবে পরিবহণ নির্ভর ব্যবসার ক্ষেত্রেও খরচ বাড়বে।
এর আগে কবে বেড়েছিল দাম?
এর আগে মার্চ মাসেও জ্বালানির দামে পরিবর্তন আনা হয়েছিল। পাশাপাশি সম্প্রতি বাণিজ্যিক গ্যাস সিলিন্ডারের দামও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফলে শিল্প ও ব্যবসা ক্ষেত্রেও চাপ বাড়ছে।
অর্থনীতিবিদদের একাংশের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে আগামী দিনে আরও মূল্যবৃদ্ধির সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
বিরোধীদের আক্রমণ
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে কেন্দ্রকে আক্রমণ করেছে বিরোধীরা। বিরোধী নেতাদের দাবি, আন্তর্জাতিক বাজারে কিছু সময় দাম কমলেও সাধারণ মানুষ তার সুবিধা পায়নি। কিন্তু দাম বাড়লেই দ্রুত সেই বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে জনগণের উপর।
লোকসভার বিরোধী দলনেতা Rahul Gandhi আগেই আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন যে, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির অজুহাতে সরকার পেট্রল ও ডিজ়েলের দাম বাড়াতে পারে।
ভবিষ্যতে আরও বাড়তে পারে?
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী কয়েক সপ্তাহ আন্তর্জাতিক বাজারের উপর নজর রাখতে হবে। যদি পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত আরও বাড়ে এবং অপরিশোধিত তেলের দাম ১০০ ডলার প্রতি ব্যারেলের কাছাকাছি পৌঁছে যায়, তাহলে ভারতেও আরও মূল্যবৃদ্ধির সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
তবে সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এক্সাইজ় ডিউটি বা অন্যান্য কর কমাতে পারে বলেও মনে করছেন অনেকে। যদিও এখনই সেই বিষয়ে স্পষ্ট কোনও ইঙ্গিত মেলেনি।
বিকল্প জ্বালানির দিকে ঝুঁকছে ভারত
জ্বালানির দামের অস্থিরতার কারণে ভারত ধীরে ধীরে বিকল্প শক্তির উপর জোর বাড়াচ্ছে। বৈদ্যুতিক গাড়ি, ইথানল মিশ্রিত জ্বালানি, সোলার এনার্জি এবং সবুজ হাইড্রোজেন প্রকল্পে বিনিয়োগ বাড়ানো হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে তেলের উপর নির্ভরতা কমানোই হবে ভারতের বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ আন্তর্জাতিক বাজারের উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দেশের অর্থনীতিকে বারবার চাপে ফেলছে।
সাধারণ মানুষের জন্য কী পরামর্শ?
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে জ্বালানি সাশ্রয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যেমন—
- অপ্রয়োজনীয় গাড়ি ব্যবহার কমানো
- কারপুলিং করা
- গাড়ির নিয়মিত সার্ভিসিং
- টায়ারের চাপ ঠিক রাখা
- পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ব্যবহার বাড়ানো
এই পদক্ষেপগুলি কিছুটা হলেও জ্বালানি খরচ কমাতে সাহায্য করতে পারে।
আন্তর্জাতিক অস্থিরতার সরাসরি প্রভাব যে ভারতের জ্বালানি বাজারে পড়ছে, তা আবারও স্পষ্ট হলো পেট্রল ও ডিজ়েলের নতুন মূল্যবৃদ্ধিতে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি, আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বৃদ্ধি এবং আমদানি নির্ভরতা— সব মিলিয়ে আগামী দিনে পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে বলে আশঙ্কা।
সাধারণ মানুষের উপর বাড়তি আর্থিক চাপের পাশাপাশি বাজারদর বৃদ্ধির আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। এখন নজর থাকবে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি কোন দিকে যায় এবং কেন্দ্র ভবিষ্যতে জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে কী পদক্ষেপ নেয় তার উপর।
