Site icon news100k

Rajesh Khanna

Spread the love

বলিউডের প্রথম সুপারস্টার Rajesh Khanna : সংগ্রাম, প্রেম, সাফল্য ও এক কিংবদন্তির জীবনগাথা

ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে এমন কিছু নাম আছে, যাদের ছাড়া বলিউডের গল্প কখনও পূর্ণ হয় না। সেই তালিকার একেবারে উপরের সারিতেই রয়েছেন Rajesh Khanna। তাঁকে বলা হয় বলিউডের “প্রথম সুপারস্টার”। ষাট ও সত্তরের দশকে তাঁর জনপ্রিয়তা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে দেশের লাখো তরুণী তাঁর ছবিতে চুমু খেয়ে চিঠি পাঠাতেন, কেউ কেউ আবার নিজের রক্ত দিয়ে প্রেমপত্র লিখতেন। তাঁর হাসি, সংলাপ, চোখের ভাষা আর আবেগঘন অভিনয় কোটি মানুষের হৃদয় জয় করেছিল।

কিন্তু এই সাফল্যের পেছনে ছিল এক কঠিন সংগ্রামের গল্প। ছোটবেলার স্বপ্ন, নাটকের প্রতি অদ্ভুত টান, পারিবারিক ওঠাপড়া, আত্মবিশ্বাস আর অক্লান্ত পরিশ্রম—সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছিল এক জীবন্ত কিংবদন্তি। আজকের এই বিশেষ ব্লগে আমরা জানব Rajesh Khanna-র জন্ম থেকে শুরু করে তাঁর শিক্ষা, পরিবার, অভিনয়ে আসার গল্প, প্রেম, বিয়ে, সুপারস্টার হয়ে ওঠা এবং জীবনের শেষ অধ্যায় পর্যন্ত এক নাটকীয় জীবনকাহিনি।


জন্ম ও শৈশব

Rajesh Khanna-র আসল নাম ছিল জতিন খান্না। তিনি জন্মগ্রহণ করেন ২৯ ডিসেম্বর ১৯৪২ সালে, ভারতের পাঞ্জাবের অমৃতসরে। তখন দেশ স্বাধীন হয়নি। চারদিকে ছিল রাজনৈতিক উত্তেজনা ও সামাজিক পরিবর্তনের সময়। সেই অস্থির সময়েই জন্ম নেন ভবিষ্যতের এই সুপারস্টার।

শৈশবে তিনি খুব সাধারণ জীবনযাপন করতেন। তাঁর জৈবিক বাবা-মা সম্পর্কে খুব বেশি তথ্য প্রকাশ্যে না থাকলেও ছোটবেলায় তাঁকে দত্তক নেন চুন্নিলাল খান্না ও লীলাবতী খান্না। তাঁদের পরিবার ছিল তুলনামূলকভাবে স্বচ্ছল। দত্তক নেওয়ার পর জতিনের জীবন অনেকটাই বদলে যায়।

ছোটবেলায় তিনি ছিলেন অত্যন্ত চঞ্চল ও কৌতূহলী। পড়াশোনার পাশাপাশি নাটক ও অভিনয়ের দিকে তাঁর ঝোঁক ছিল প্রবল। স্কুলের অনুষ্ঠানে তিনি নিয়মিত অংশ নিতেন। বন্ধুদের সঙ্গে মিলে নাটক করতেন, আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সিনেমার সংলাপ বলতেন। তখন থেকেই তাঁর মনে জন্ম নেয় বড় অভিনেতা হওয়ার স্বপ্ন।


শিক্ষা ও ছাত্রজীবন

Rajesh Khanna মুম্বাইয়ের সেন্ট সেবাস্টিয়ান গোয়ান হাই স্কুলে পড়াশোনা করেন। ছাত্রজীবনে তিনি খুব মেধাবী না হলেও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে ছিলেন অসাধারণ সক্রিয়। স্কুলে নাটক মঞ্চস্থ হলেই তিনি ছিলেন প্রধান আকর্ষণ।

পরে তিনি কে.সি. কলেজ এবং পুনের কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করেন। কলেজ জীবনে এসে তাঁর অভিনয়ের নেশা আরও বাড়তে থাকে। বন্ধুরা তাঁকে উৎসাহ দিতেন। অনেকেই বলতেন, তাঁর চোখে এমন এক আবেগ আছে যা দর্শককে মুহূর্তে স্পর্শ করতে পারে।

এই সময়েই তিনি থিয়েটারের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হয়ে পড়েন। কলেজ ফেস্ট, মঞ্চনাটক এবং অভিনয় প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে শুরু করেন। সেখান থেকেই তাঁর আত্মবিশ্বাস বাড়তে থাকে।


নাটকের প্রতি ভালোবাসা কেন জন্মেছিল?

অনেকেই প্রশ্ন করেন, কেন Rajesh Khanna নাটকের প্রতি এত আকৃষ্ট হয়েছিলেন?

এর উত্তর লুকিয়ে ছিল তাঁর আবেগপ্রবণ ব্যক্তিত্বে। ছোটবেলা থেকেই তিনি মানুষের মন বোঝার চেষ্টা করতেন। তিনি লক্ষ্য করতেন, কিভাবে একজন অভিনেতা পর্দায় হাসে, কাঁদে, ভালোবাসে এবং দর্শকের হৃদয়ে জায়গা করে নেয়।

তিনি বিশ্বাস করতেন, অভিনয় শুধুমাত্র বিনোদন নয়—এটি মানুষের অনুভূতির ভাষা। নাটক তাঁকে সেই অনুভূতি প্রকাশের সুযোগ দিয়েছিল। মঞ্চে দাঁড়িয়ে দর্শকের হাততালি শুনে তিনি যেন নিজের অস্তিত্ব খুঁজে পেতেন।

বন্ধুরা যখন অন্য পেশার স্বপ্ন দেখতেন, তখন জতিন খান্না শুধু একটাই স্বপ্ন দেখতেন—একদিন তিনি বড় অভিনেতা হবেন।


অভিনয়ে প্রবেশের সংগ্রাম

ষাটের দশকে বলিউডে প্রবেশ করা মোটেও সহজ ছিল না। তখন ইন্ডাস্ট্রিতে টিকে থাকতে দরকার ছিল পরিচিতি, টাকা এবং ভাগ্য। কিন্তু Rajesh Khanna নিজের প্রতিভার উপর ভরসা রেখেছিলেন।

১৯৬৫ সালে ইউনাইটেড প্রডিউসারস এবং ফিল্মফেয়ার যৌথভাবে একটি ট্যালেন্ট হান্ট প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। হাজার হাজার প্রতিযোগীর মধ্যে অংশ নেন জতিন খান্না। তাঁর আত্মবিশ্বাসী অভিনয় এবং অসাধারণ ব্যক্তিত্ব বিচারকদের মুগ্ধ করে।

শেষ পর্যন্ত তিনিই জয়ী হন। আর এই জয়ই বদলে দেয় তাঁর জীবন।

সেই সময়ই তাঁর নাম বদলে রাখা হয় “রাজেশ খান্না”। কারণ নির্মাতারা মনে করেছিলেন, এই নামটি আরও বেশি আকর্ষণীয় এবং তারকাসুলভ।


প্রথম সিনেমা ও বলিউডে পথচলা

১৯৬৬ সালে মুক্তি পায় তাঁর প্রথম চলচ্চিত্র Aakhri Khat। যদিও ছবিটি বড় বাণিজ্যিক সাফল্য পায়নি, কিন্তু তাঁর অভিনয় দর্শকদের নজর কাড়ে।

এরপর একে একে তিনি অভিনয় করেন Raaz, Baharon Ke Sapne, Aurat প্রভৃতি ছবিতে। তবে প্রকৃত সাফল্য আসে ১৯৬৯ সালে।

সেই বছর মুক্তি পায় Aradhana

এই ছবিই বদলে দেয় ভারতীয় সিনেমার ইতিহাস।


“আরাধনা” এবং সুপারস্টার জন্মের গল্প

Aradhana মুক্তির পর গোটা ভারত যেন পাগল হয়ে যায় Rajesh Khanna-কে নিয়ে।

তাঁর অভিনয়, সংলাপ, রোম্যান্টিক স্টাইল এবং গান—সবকিছুই মানুষের হৃদয়ে ঝড় তোলে। বিশেষ করে “মেরে সপ্নো কি রানি” গানটি তাঁকে রাতারাতি সুপারস্টার বানিয়ে দেয়।

এরপর আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।

তিনি একের পর এক হিট সিনেমা উপহার দিতে থাকেন—

সেই সময় তাঁর জনপ্রিয়তা এতটাই ছিল যে সিনেমা হলের বাইরে হাজার হাজার মানুষ ভিড় করত শুধু তাঁকে একবার দেখার জন্য।


ব্যক্তিগত জীবন ও প্রেম

১৯৭৩ সালে Rajesh Khanna বিয়ে করেন জনপ্রিয় অভিনেত্রী Dimple Kapadia-কে। তখন ডিম্পলের বয়স ছিল মাত্র ১৬ বছর।

তাঁদের বিয়ে নিয়ে গোটা দেশে তুমুল আলোচনা শুরু হয়। কারণ তখন রাজেশ খান্না ছিলেন দেশের সবচেয়ে বড় তারকা।

এই দম্পতির দুই কন্যা সন্তান জন্ম নেয়—

যদিও পরবর্তীতে তাঁদের সম্পর্কের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়, তবুও রাজেশ খান্না তাঁর পরিবারকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন।


অমিতাভ বচ্চনের আগমন ও ক্যারিয়ারের পরিবর্তন

সত্তরের দশকের শেষ দিকে বলিউডে নতুন এক যুগের সূচনা হয়। “অ্যাংরি ইয়ং ম্যান” ইমেজ নিয়ে উঠে আসেন Amitabh Bachchan।

দর্শকদের পছন্দ বদলাতে শুরু করে। রোম্যান্টিক নায়কের পরিবর্তে অ্যাকশন হিরোর জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে। ফলে ধীরে ধীরে রাজেশ খান্নার ছবির সাফল্য কমতে শুরু করে।

তবে তিনি কখনও অভিনয় ছাড়েননি। বরং চরিত্রাভিনেতা হিসেবেও নিজেকে প্রমাণ করার চেষ্টা চালিয়ে যান।


রাজনীতিতে যোগদান

অভিনয়ের পাশাপাশি Rajesh Khanna রাজনীতিতেও যোগ দেন। তিনি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের হয়ে নির্বাচনে অংশ নেন এবং সাংসদ হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

মানুষ তাঁকে শুধু অভিনেতা হিসেবেই নয়, একজন মানবিক মানুষ হিসেবেও সম্মান করতেন।


জীবনের শেষ অধ্যায়

জীবনের শেষদিকে তিনি অনেকটাই নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েছিলেন। শারীরিক অসুস্থতাও বাড়তে থাকে। তবুও তিনি মাঝে মাঝে বিজ্ঞাপন ও টেলিভিশনে উপস্থিত হতেন।

২০১২ সালের ১৮ জুলাই মুম্বাইয়ে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

তাঁর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই গোটা দেশ শোকে স্তব্ধ হয়ে যায়। লাখো ভক্ত চোখের জলে বিদায় জানান তাঁদের প্রিয় “কাকা”-কে।


কেন আজও তিনি কিংবদন্তি?

Rajesh Khanna শুধুমাত্র একজন অভিনেতা ছিলেন না। তিনি ছিলেন এক আবেগ, এক যুগের প্রতীক।

তাঁর অভিনয়ের মধ্যে ছিল কোমলতা, ভালোবাসা, দুঃখ, রোম্যান্স এবং জীবনের বাস্তবতা। তাঁর সংলাপ আজও মানুষের মুখে মুখে ফেরে।

বিশেষ করে Anand ছবির সেই বিখ্যাত সংলাপ—

“বাবুমশাই, জিন্দেগি বড়ি হোনি চাইয়ে… লম্বি নেহি।”

এই একটি সংলাপ যেন তাঁর পুরো জীবনদর্শনকে প্রকাশ করে।


রাজেশ খান্নার জনপ্রিয় কিছু সিনেমা

বছর সিনেমা
1969 Aradhana
1969 Do Raaste
1970 Safar
1970 Sachaa Jhutha
1971 Anand
1971 Haathi Mere Saathi
1972 Amar Prem
1972 Bawarchi
1973 Daag
1974 Roti
1980 Red Rose
1984 Awaaz
1991 Rupaye Dus Karod

পুরস্কার ও সম্মান

Rajesh Khanna তাঁর দীর্ঘ ক্যারিয়ারে অসংখ্য পুরস্কার অর্জন করেন। তিনি একাধিকবার ফিল্মফেয়ার পুরস্কার জিতেছেন। মৃত্যুর পর ভারত সরকার তাঁকে পদ্মভূষণ সম্মানে ভূষিত করে।


এক সাধারণ ছেলের অসাধারণ হয়ে ওঠার গল্পই হল Rajesh Khanna-র জীবন।

তিনি প্রমাণ করেছিলেন, স্বপ্ন যদি সত্যি হৃদয় থেকে দেখা যায়, তবে একদিন তা বাস্তব হয়। অভিনয়ের প্রতি অগাধ ভালোবাসা, কঠোর পরিশ্রম এবং আত্মবিশ্বাস তাঁকে পৌঁছে দিয়েছিল সাফল্যের সর্বোচ্চ শিখরে।

আজও যখন পুরনো দিনের বলিউডের কথা ওঠে, তখন প্রথমেই মনে পড়ে তাঁর সেই মিষ্টি হাসি, আবেগঘন চোখ আর রোম্যান্টিক সংলাপ।

তিনি নেই, কিন্তু তাঁর সিনেমা, গান এবং স্মৃতি আজও কোটি মানুষের হৃদয়ে অমর হয়ে আছে।

Please follow and like us:
Exit mobile version