Site icon news100k

Rajinikanth

Spread the love

দক্ষিণের সুপারস্টার Rajinikanth — বাস কন্ডাক্টর থেকে সিনেমার দেবতা হয়ে ওঠার অবিশ্বাস্য গল্প

দক্ষিণের সুপারস্টার Rajinikanth — বাস কন্ডাক্টর থেকে সিনেমার দেবতা হয়ে ওঠার অবিশ্বাস্য গল্প

ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে এমন কিছু নাম আছে, যাদের জনপ্রিয়তা শুধু একজন অভিনেতার সীমার মধ্যে আটকে থাকে না। তারা হয়ে ওঠেন এক একটি আবেগ, এক একটি সংস্কৃতি। দক্ষিণ ভারতের সেই কিংবদন্তি নামগুলোর মধ্যে সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্র হলেন Rajinikanth। কোটি কোটি ভক্তের কাছে তিনি শুধু একজন অভিনেতা নন, তিনি “থালাইভা” — অর্থাৎ নেতা। তাঁর স্টাইল, সংলাপ বলার ধরন, চশমা ঘোরানোর কায়দা কিংবা সিগারেট ছুঁড়ে মুখে নেওয়ার ভঙ্গি আজও সিনেমাপ্রেমীদের কাছে এক অন্যরকম উন্মাদনা।

কিন্তু এই সুপারস্টারের জীবন শুরু হয়েছিল একেবারে সাধারণ পরিবারে। অর্থকষ্ট, সংগ্রাম, অপমান আর কঠোর পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে এগিয়ে গিয়েছিল তাঁর জীবন। বাস কন্ডাক্টরের চাকরি থেকে ভারতীয় সিনেমার সর্বোচ্চ পারিশ্রমিকপ্রাপ্ত অভিনেতাদের একজন হয়ে ওঠার গল্প যেন সিনেমাকেও হার মানায়।


জন্ম ও পারিবারিক পরিচয়

Rajinikanth-এর আসল নাম শিবাজি রাও গায়কোয়াড়। তাঁর জন্ম ১৯৫০ সালের ১২ ডিসেম্বর ভারতের Bengaluru শহরে। যদিও তাঁর পরিবার মূলত মহারাষ্ট্রের মারাঠি পরিবার ছিল। বাবা রামোজি রাও গায়কোয়াড় ছিলেন একজন পুলিশ কনস্টেবল এবং মা রামাবাই ছিলেন গৃহবধূ।

পরিবারে চার ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবচেয়ে ছোট। ছোটবেলায় তাঁর জীবন খুব একটা সুখের ছিল না। সংসারে অর্থাভাব ছিল নিত্যসঙ্গী। ছোট্ট শিবাজিকে অনেক সময় পড়াশোনার পাশাপাশি বাড়ির কাজেও সাহায্য করতে হত।

মাত্র পাঁচ বছর বয়সে তিনি তাঁর মাকে হারান। এই ঘটনাই তাঁর জীবনে বড় ধাক্কা হয়ে আসে। মায়ের মৃত্যু তাঁকে ভিতর থেকে বদলে দেয়। ছোটবেলা থেকেই তিনি চুপচাপ স্বভাবের হয়ে পড়েন।


শৈশব ও পড়াশোনা

Rajinikanth-এর শৈশব কেটেছে বেঙ্গালুরুর সাধারণ এলাকায়। তিনি প্রথমে আচার্য পাঠশালায় পড়াশোনা করেন। পরে ভর্তি হন রামকৃষ্ণ মিশন পরিচালিত বিদ্যালয়ে।

স্কুলজীবনে তিনি খুব মেধাবী ছাত্র না হলেও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে দারুণ আগ্রহ দেখাতেন। নাটক, অভিনয় এবং মঞ্চে পারফর্ম করতে তিনি খুব ভালোবাসতেন। বিশেষ করে পৌরাণিক চরিত্রে অভিনয় করতে তাঁর ভীষণ আনন্দ লাগত।

বন্ধুরা তখনই বুঝতে শুরু করেছিল, এই ছেলেটার মধ্যে আলাদা কিছু আছে। কিন্তু পরিবারের আর্থিক অবস্থা এতটাই দুর্বল ছিল যে অভিনয় নিয়ে স্বপ্ন দেখাটা তখন প্রায় অসম্ভব মনে হত।


জীবনের কঠিন সংগ্রাম

স্কুলের পড়াশোনা শেষ করার পর সংসারের দায়িত্ব এসে পড়ে তরুণ শিবাজির কাঁধে। পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নতির জন্য তিনি বিভিন্ন ছোটখাটো কাজ করতে শুরু করেন।

কখনও কুলি, কখনও কাঠমিস্ত্রির সহকারী, আবার কখনও দিনমজুর — জীবনের কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করতে করতে তিনি বুঝে গিয়েছিলেন, সাফল্য এত সহজে ধরা দেবে না।

পরে তিনি বেঙ্গালুরু ট্রান্সপোর্ট সার্ভিসে বাস কন্ডাক্টরের চাকরি পান। এই চাকরিই তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

বাস কন্ডাক্টর হিসেবে কাজ করার সময়ও তাঁর স্টাইল ছিল একেবারে আলাদা। টিকিট কাটার সময় তাঁর অদ্ভুত স্টাইল, যাত্রীদের সঙ্গে মজার কথা বলা — সবকিছুই মানুষের নজর কাড়ত। সহকর্মীরা বলতেন, “এই ছেলেটা একদিন বড় কিছু করবে।”


নাটকের প্রতি আকর্ষণ

বাস কন্ডাক্টরের চাকরি করার সময়ও অভিনয়ের নেশা তাঁকে ছাড়েনি। কাজের ফাঁকে তিনি বিভিন্ন নাট্যদলে অভিনয় করতেন।

তাঁর অভিনয় দেখে বন্ধুরা তাঁকে উৎসাহ দিতে শুরু করে। বিশেষ করে তাঁর এক বন্ধু রাজ বাহাদুর তাঁকে বলেছিলেন, “তুমি সিনেমায় যাও। তোমার মধ্যে নায়ক হওয়ার ক্ষমতা আছে।”

এই কথাই যেন তাঁর জীবনের টার্নিং পয়েন্ট হয়ে ওঠে।

পরে রাজ বাহাদুরই তাঁকে সাহায্য করেন অভিনয়ের প্রশিক্ষণ নিতে। তিনি ভর্তি হন Madras Film Institute-এ।

সেখানে গিয়ে তিনি অভিনয়ের প্রকৃত শিক্ষা নিতে শুরু করেন। শুরুতে তামিল ভাষা জানতেন না বলে অনেক সমস্যায় পড়তে হয়েছিল। কিন্তু তিনি হার মানেননি।


সিনেমায় প্রবেশের গল্প

Rajinikanth-এর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয় পরিচালক K. Balachander-এর হাত ধরে।

একদিন অভিনয় প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে তাঁর অভিনয় দেখে মুগ্ধ হন পরিচালক বালাচন্দর। তিনিই প্রথম শিবাজি রাওকে বলেন তামিল ভাষা শিখতে।

বালাচন্দর তাঁকে সুযোগ দেন ১৯৭৫ সালের Apoorva Raagangal সিনেমায়। সেখানে তাঁর চরিত্র ছোট হলেও দর্শক তাঁর অভিনয় লক্ষ্য করতে শুরু করে।

এই সিনেমাতেই শুরু হয় নতুন এক অধ্যায়।


ভিলেন থেকে নায়ক

ক্যারিয়ারের শুরুতে Rajinikanth বেশিরভাগ সময় ভিলেন বা পার্শ্বচরিত্রে অভিনয় করতেন। কিন্তু তাঁর অভিনয়ের তীব্রতা এতটাই শক্তিশালী ছিল যে দর্শক তাঁকে আলাদা করে মনে রাখতে শুরু করে।

ধীরে ধীরে তিনি নায়কের চরিত্রে সুযোগ পেতে শুরু করেন। তাঁর অভিনয়ে ছিল সাধারণ মানুষের রাগ, দুঃখ, প্রতিবাদ এবং আবেগ। ফলে দর্শক খুব দ্রুত তাঁর সঙ্গে নিজেদের সম্পর্ক খুঁজে পায়।

১৯৮০-এর দশকে তিনি দক্ষিণ ভারতের সবচেয়ে জনপ্রিয় অভিনেতাদের একজন হয়ে ওঠেন।


সুপারস্টার হয়ে ওঠার গল্প

Rajinikanth-এর জনপ্রিয়তা শুধু দক্ষিণ ভারতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। তাঁর সিনেমা ধীরে ধীরে সারা ভারত এবং বিদেশেও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

Baashha, Muthu, Sivaji, Enthiran এবং Jailer তাঁকে কিংবদন্তির আসনে বসিয়ে দেয়।

বিশেষ করে তাঁর স্টাইল ছিল একেবারে ইউনিক। চশমা ঘোরানো, সিগারেট ছোড়া কিংবা সংলাপ বলার স্টাইল আজও অসংখ্য অভিনেতা নকল করার চেষ্টা করেন।


ব্যক্তিগত জীবন

১৯৮১ সালে Rajinikanth বিয়ে করেন লতা রঙ্গাচারীকে। তাঁদের দুই মেয়ে — ঐশ্বর্যা ও সৌন্দর্যা।

ঐশ্বর্যা বিয়ে করেন Dhanush-কে। ফলে চলচ্চিত্র জগতের সঙ্গে তাঁদের পরিবারের সম্পর্ক আরও গভীর হয়।


আধ্যাত্মিক জীবন

যদিও তিনি সুপারস্টার, তবুও বাস্তব জীবনে খুব সাধারণভাবে থাকতে পছন্দ করেন।

তিনি নিয়মিত হিমালয়ে ধ্যান করতে যান। আধ্যাত্মিকতা তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অনেকেই বলেন, এত বড় তারকা হওয়ার পরেও তাঁর মধ্যে অহংকার নেই।

এই সাধারণ জীবনযাপনই তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে।


রাজনৈতিক জল্পনা

দীর্ঘদিন ধরেই তাঁকে নিয়ে রাজনীতিতে আসার জল্পনা ছিল। বহু রাজনৈতিক দলও তাঁকে নিজেদের দলে আনার চেষ্টা করেছে।

যদিও তিনি সরাসরি রাজনীতিতে খুব সক্রিয় হননি, তবুও তাঁর জনপ্রিয়তা রাজনৈতিক মহলেও ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে।


আন্তর্জাতিক জনপ্রিয়তা

জাপানে Muthu মুক্তির পর সেখানে তিনি বিশাল জনপ্রিয়তা পান। জাপানের মানুষ তাঁকে “ড্যান্সিং মহারাজা” নামে ডাকতে শুরু করে।

তাঁর সিনেমা এখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মুক্তি পায়। বিদেশে ভারতীয় সিনেমার জনপ্রিয়তা বাড়ানোর ক্ষেত্রেও তাঁর বড় ভূমিকা রয়েছে।


পুরস্কার ও সম্মান

Rajinikanth বহু জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সম্মান পেয়েছেন।

তিনি ভারতের তৃতীয় সর্বোচ্চ নাগরিক সম্মান Padma Bhushan এবং পরে Padma Vibhushan লাভ করেন।

২০২১ সালে তিনি পান ভারতীয় চলচ্চিত্রের সর্বোচ্চ সম্মান Dadasaheb Phalke Award।


কেন মানুষ তাঁকে এত ভালোবাসে?

কারণ তিনি শুধু একজন অভিনেতা নন। তাঁর জীবনের গল্প সাধারণ মানুষের গল্প।

একজন দরিদ্র পরিবারের ছেলে, যে বাসে টিকিট কেটেছে, কষ্ট করেছে, অপমান সহ্য করেছে — সেই মানুষটাই আজ কোটি মানুষের হৃদয়ের রাজা।

তাঁর সাফল্য প্রমাণ করে, স্বপ্ন যদি সত্যি মনে থেকে দেখা যায়, তাহলে জীবনের যেকোনো বাধা জয় করা সম্ভব।


সিনেমার বাইরের মানুষ রাজিনীকান্ত

অনেকেই জানেন না, তিনি অসংখ্য মানুষের গোপনে সাহায্য করেন। দরিদ্র মানুষ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজসেবামূলক কাজেও তিনি নিয়মিত অর্থ সাহায্য করেন।

তিনি মিডিয়ার সামনে এসব প্রচার করতে পছন্দ করেন না। এই মানবিক দিকটাই তাঁকে আরও বড় মানুষ করে তুলেছে।


আজও কেন তিনি সুপারস্টার?

বয়স ৭০ পেরিয়ে গেলেও তাঁর সিনেমা মুক্তি মানেই উৎসব।

তাঁর সিনেমা রিলিজের দিন দক্ষিণ ভারতে ভক্তরা মন্দিরে পূজা দেন, বিশাল কাটআউট বানান, দুধ ঢেলে উদযাপন করেন। এমন উন্মাদনা ভারতীয় সিনেমায় খুব কম অভিনেতার ক্ষেত্রেই দেখা যায়।


Rajinikanth-এর জীবন এক অনুপ্রেরণার গল্প। তিনি প্রমাণ করেছেন, সাফল্যের জন্য জন্মগত সুবিধা দরকার হয় না — দরকার ইচ্ছাশক্তি, কঠোর পরিশ্রম এবং নিজের স্বপ্নকে আঁকড়ে ধরে রাখার সাহস।

বাস কন্ডাক্টর থেকে সুপারস্টার — এই যাত্রা শুধু একজন অভিনেতার গল্প নয়, এটি ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়।

আজও কোটি কোটি মানুষ তাঁর সিনেমা দেখেন, তাঁর সংলাপ বলেন, তাঁর স্টাইল নকল করেন। কারণ রাজিনীকান্ত শুধুমাত্র একজন অভিনেতা নন, তিনি এক জীবন্ত কিংবদন্তি।

Rajinikanth-এর বছরভিত্তিক সমস্ত সিনেমার তালিকা — সুপারস্টারের চলচ্চিত্র যাত্রা

ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে Rajinikanth এমন এক নাম, যিনি কয়েক দশক ধরে দর্শকদের মন জয় করে চলেছেন। ভিলেন চরিত্র দিয়ে শুরু করে দক্ষিণ ভারতের “থালাইভা” হয়ে ওঠার এই যাত্রা সত্যিই অবিশ্বাস্য। তামিল, তেলুগু, কন্নড়, মালয়ালম, হিন্দি এবং বাংলা সহ একাধিক ভাষায় অভিনয় করেছেন তিনি।

নিচে বছরভিত্তিক তাঁর উল্লেখযোগ্য সিনেমাগুলোর তালিকা দেওয়া হল।


১৯৭৫

এটাই ছিল তাঁর অভিনয় জীবনের শুরু।


১৯৭৬

এই সময় তিনি মূলত নেগেটিভ চরিত্রে অভিনয় করতেন।


১৯৭৭


১৯৭৮

এই বছর থেকেই তিনি নায়ক হিসেবে জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করেন।


১৯৭৯


১৯৮০


১৯৮১


১৯৮২


১৯৮৩

হিন্দি সিনেমায়ও তাঁর জনপ্রিয়তা বাড়তে শুরু করে।


১৯৮৪


১৯৮৫


১৯৮৬


১৯৮৭


১৯৮৮


১৯৮৯


১৯৯০


১৯৯১


১৯৯২


১৯৯৩


১৯৯৪


১৯৯৫

এই দুটি সিনেমাই তাঁকে আন্তর্জাতিক সুপারস্টারে পরিণত করে।


১৯৯৭


১৯৯৯


২০০২


২০০৫

এই সিনেমা দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে অন্যতম বড় হিট।


২০০৭


২০১০

এই সাইন্স ফিকশন সিনেমা ভারতীয় চলচ্চিত্রে নতুন যুগের সূচনা করে।


২০১৪


২০১৬


২০১৮


২০১৯


২০২০


২০২১


২০২৩


২০২৪ ও পরবর্তী প্রজেক্ট


রাজিনীকান্তের সিনেমা কেন এত জনপ্রিয়?

Rajinikanth-এর সিনেমা মানেই বিশাল এন্ট্রি, দুর্দান্ত সংলাপ, স্টাইলিশ অ্যাকশন এবং সাধারণ মানুষের আবেগ। তিনি শুধু নায়ক নন, তিনি এক সাংস্কৃতিক আইকন।

তাঁর প্রতিটি যুগে আলাদা আলাদা স্টাইল দেখা গেছে—


প্রায় পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে Rajinikanth ভারতীয় সিনেমায় নিজের আধিপত্য বজায় রেখেছেন। তাঁর সিনেমার তালিকা শুধু একটি অভিনেতার ক্যারিয়ার নয়, এটি ভারতীয় চলচ্চিত্র ইতিহাসের এক বিশাল অধ্যায়।

আজও তাঁর নতুন সিনেমা মুক্তি মানেই উৎসব। আর সেই কারণেই রাজিনীকান্ত শুধু একজন অভিনেতা নন — তিনি ভারতীয় সিনেমার জীবন্ত কিংবদন্তি।

Please follow and like us:
Exit mobile version