Site icon news100k

টি-২০ বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্নে বিভোর , ব্যর্থতাকে সঙ্গী করেই এগিয়ে চলার অঙ্গীকার,প্রত্যাবর্তনের আবেগঘন গল্প,Shreyanka Patil

Shreyanka Patil

Spread the love

টি-২০ বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্নে বিভোর শ্রেয়াঙ্কা পাটিল,

ভারতীয় নারী ক্রিকেট দলের তরুণ অলরাউন্ডার Shreyanka Patil আবারও শিরোনামে। দীর্ঘ চোটের ধাক্কা কাটিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তনের পর এবার তাঁর লক্ষ্য একটাই— ইংল্যান্ডে অনুষ্ঠিতব্য নারী টি-২০ বিশ্বকাপের ট্রফি জয়। তবে শুধু সাফল্যের স্বপ্ন নয়, ব্যর্থতাকেও সমানভাবে গ্রহণ করার মানসিকতা তৈরি করেছেন তিনি। আর সেই কারণেই বর্তমানে ভারতীয় নারী ক্রিকেটের অন্যতম অনুপ্রেরণার নাম হয়ে উঠেছেন শ্রেয়াঙ্কা।

প্রত্যাবর্তনের আবেগঘন গল্প

চোটের কারণে এক বছরেরও বেশি সময় আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের বাইরে থাকতে হয়েছিল শ্রেয়াঙ্কাকে। ২০২৫ সালের বেশিরভাগ সময় তিনি মাঠের বাইরে কাটিয়েছেন। পুনর্বাসন, ফিটনেস এবং মানসিক দৃঢ়তার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর অবশেষে অস্ট্রেলিয়া সফরে ভারতের জার্সিতে ফিরে আসেন তিনি।

ফেরার ম্যাচটি ছিল আবেগে ভরা। সিডনিতে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম টি-২০ ম্যাচে তিনি প্রত্যাশামতো পারফর্ম করতে পারেননি। মাত্র দুই ওভারে ২৪ রান খরচ করেছিলেন। ম্যাচ শেষে হতাশ হয়ে ড্রেসিংরুমে ফিরে চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি।

সেই কঠিন মুহূর্তে তাঁর পাশে দাঁড়ান ভারতীয় দলের সহ-অধিনায়ক ও ঘনিষ্ঠ বন্ধু Smriti Mandhana। শ্রেয়াঙ্কা পরে জানান, স্মৃতি তাঁকে জড়িয়ে ধরে বলেছিলেন যে তিনি গর্বিত, কারণ এত লড়াইয়ের পর আবার ক্রিকেটে ফিরতে পেরেছেন। সেই সমর্থনই তাঁকে নতুন করে আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছিল।

ব্যর্থতাকে মেনে নেওয়ার শিক্ষা

শ্রেয়াঙ্কার মতে, একজন ক্রীড়াবিদের জীবনে শুধু সাফল্য নয়, ব্যর্থতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি বিশ্বাস করেন, একদিন পাঁচ উইকেট পাওয়া যাবে, আবার অন্যদিন ৫০ রানও খরচ হতে পারে। ক্রিকেট এমনই খেলা যেখানে প্রতিদিন সাফল্য আসে না। তাই ব্যর্থতাকে মেনে নিয়ে দ্রুত সেখান থেকে বেরিয়ে আসাই একজন বড় খেলোয়াড়ের পরিচয়।

এই দর্শনই তাঁকে চোট-পরবর্তী সময়ে মানসিকভাবে আরও শক্তিশালী করে তুলেছে।

ক্রিকেটপ্রেমী এক কন্যার গল্প ,বেঙ্গালুরুর এক কিশোরী থেকে ভারতীয় নারী ক্রিকেটের উজ্জ্বল নক্ষত্র, Shreyanka Patil

কর্ণাটকের সোনার মেয়ে

কর্ণাটক ক্রিকেটে উঠে আসার সময় থেকেই শ্রেয়াঙ্কাকে বিশেষ প্রতিভা হিসেবে দেখা হতো। অফ-স্পিন বোলিংয়ের পাশাপাশি ব্যাট হাতেও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারতেন তিনি।

ঘরোয়া ক্রিকেটে ধারাবাহিক সাফল্যের পর সুযোগ পান ভারতের ‘এ’ দলে। এরপর নারী প্রিমিয়ার লিগে সুযোগ আসে। সেখানেই তাঁর ক্রিকেট জীবন নতুন মোড় নেয়।

ডব্লিউপিএল বদলে দিয়েছে ক্যারিয়ার

নারী প্রিমিয়ার লিগে Royal Challengers Bengaluru Women-এর হয়ে খেলার সুযোগ পাওয়ার পর শ্রেয়াঙ্কা দ্রুত সবার নজর কাড়েন।

বিশ্বের সেরা ক্রিকেটারদের সঙ্গে ড্রেসিংরুম ভাগ করে নেওয়ার সুযোগ তাঁর আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেয়। ধীরে ধীরে তিনি দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্যে পরিণত হন।

২০২৪ সালে তাঁর অসাধারণ বোলিং পারফরম্যান্সের সুবাদে দল শিরোপা জেতে এবং তিনি পার্পল ক্যাপ অর্জন করেন। সেই সাফল্যের পর ভারতীয় দলে তাঁর অবস্থান আরও শক্ত হয়।

চোটের অন্ধকার অধ্যায়

সাফল্যের মধ্যেই হঠাৎ বড় ধাক্কা আসে। ২০২৪ সালের শেষ দিকে গুরুতর চোটের কারণে দীর্ঘ সময় মাঠের বাইরে থাকতে হয় তাঁকে।

একের পর এক পুনর্বাসন প্রক্রিয়া, চিকিৎসা এবং অনুশীলনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। যখনই মাঠে ফেরার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, নতুন কোনো শারীরিক সমস্যা সামনে এসেছে।

এই সময়ে আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেললেও শেষ পর্যন্ত তিনি হাল ছাড়েননি।

বন্ধুদের সমর্থন

শ্রেয়াঙ্কার মতে, চোটের সময় তিনি বন্ধুত্বের প্রকৃত মূল্য বুঝতে পেরেছেন।

স্মৃতি মন্ধানা ছাড়াও Jemimah Rodrigues, Arundhati Reddy, Renuka Singh Thakur এবং কানিকা আহুজার মতো সতীর্থরা নিয়মিত তাঁর খোঁজ নিয়েছেন।

তাঁদের ভালোবাসা ও সমর্থনই কঠিন সময়ে মানসিক শক্তি জুগিয়েছে।

নিজের শরীরকে নতুন করে চিনেছেন

চোটের অভিজ্ঞতা তাঁকে শরীর সম্পর্কে নতুন উপলব্ধি দিয়েছে।

আগে ছোটখাটো ব্যথা বা ক্লান্তিকে গুরুত্ব না দিয়ে অনুশীলন চালিয়ে যেতেন। এখন তিনি বুঝতে শিখেছেন কখন শরীরকে বিশ্রাম দিতে হয় এবং কখন সর্বোচ্চ পরিশ্রম করতে হয়।

তাঁর মতে, দীর্ঘ ক্যারিয়ারের জন্য শুধু কঠোর পরিশ্রম করলেই হয় না, নিজের শরীরের কথাও শুনতে হয়।

এসপি৩১ ফাউন্ডেশন: সমাজের জন্য নতুন উদ্যোগ

মাঠের বাইরেও শ্রেয়াঙ্কা এখন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।

তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন SP31 Foundation, যার লক্ষ্য আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা প্রতিভাবান নারী ক্রিকেটারদের সহায়তা করা।

তাঁর ব্যক্তিগত সুগন্ধি ব্র্যান্ড “317” থেকে যে আয় হবে, তার একটি অংশ এই ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে তরুণ ক্রিকেটারদের উন্নয়নে ব্যয় করা হবে।

শ্রেয়াঙ্কা বিশ্বাস করেন, ভারতে অসংখ্য প্রতিভা রয়েছে যারা শুধুমাত্র অর্থের অভাবে এগিয়ে যেতে পারে না। তাঁদের পাশে দাঁড়ানোই তাঁর লক্ষ্য।

অস্ট্রেলিয়ায় প্রত্যাবর্তনের নায়ক

অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে প্রথম ম্যাচে ব্যর্থ হলেও তৃতীয় টি-২০ ম্যাচে অসাধারণভাবে ঘুরে দাঁড়ান শ্রেয়াঙ্কা।

অ্যাডিলেডে অনুষ্ঠিত সেই ম্যাচে তিনি ৩ উইকেট নিয়ে ভারতকে ঐতিহাসিক সিরিজ জয়ে সাহায্য করেন।

বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়ার তারকা ব্যাটার Ellyse Perry-র উইকেট ছিল ম্যাচের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত।

সেই পারফরম্যান্সের পর তিনি অনুভব করেন— “শ্রেয়াঙ্কা আবার ফিরে এসেছে।”

বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন

২০২৪ সালের টি-২০ বিশ্বকাপে ভারতের হতাশাজনক পারফরম্যান্সের পর এবার নতুন উদ্যমে প্রস্তুতি নিচ্ছে দল।

শ্রেয়াঙ্কার লক্ষ্য শুধু ভালো খেলা নয়, বিশ্বকাপ জয় করা।

২০২৫ সালে লন্ডনের Lord’s Cricket Ground সফরের সময় তিনি একটি ছবি পোস্ট করে লিখেছিলেন যে এক বছর পর তিনি টি-২০ বিশ্বকাপ ট্রফি নিয়ে এই ব্যালকনিতে দাঁড়াতে চান।

আজও সেই স্বপ্নই তাঁকে অনুপ্রাণিত করে।

বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার অপেক্ষায়

ইংল্যান্ডের মাটিতে অনুষ্ঠিতব্য নারী টি-২০ বিশ্বকাপের প্রস্তুতি ম্যাচগুলোতেও দুর্দান্ত ফর্মে রয়েছেন শ্রেয়াঙ্কা।

দুটি প্রস্তুতি ম্যাচে তিনি মোট ৬ উইকেট নিয়েছেন এবং দলের জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।

এতে স্পষ্ট যে তিনি শুধু স্বপ্ন দেখছেন না, সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য সর্বোচ্চ প্রস্তুতিও নিচ্ছেন।

শ্রেয়াঙ্কা পাটিলের গল্প শুধুমাত্র একজন ক্রিকেটারের সাফল্যের কাহিনি নয়। এটি সংগ্রাম, চোট, মানসিক দৃঢ়তা, বন্ধুত্ব এবং প্রত্যাবর্তনের এক অনুপ্রেরণামূলক অধ্যায়।

এক সময় যিনি চোটের কারণে হতাশায় ভেঙে পড়েছিলেন, তিনিই আজ বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্নে বিভোর। তাঁর বিশ্বাস— সাফল্য আসবে, তবে তার জন্য ব্যর্থতাকেও গ্রহণ করতে হবে।

ভারতীয় নারী ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ তারকাদের মধ্যে শ্রেয়াঙ্কা নিঃসন্দেহে অন্যতম উজ্জ্বল নাম। এখন দেখার বিষয়, তাঁর বহুদিনের স্বপ্ন পূরণ করে তিনি কি না লর্ডসের ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে ভারতের হয়ে টি-২০ বিশ্বকাপ ট্রফি উঁচিয়ে ধরতে পারেন।

Please follow and like us:
Exit mobile version