siya goyal
পুনের পাহাড়ে প্রেম, প্রতারণা ও মৃত্যু!
নিজস্ব প্রতিবেদন | ২৩ জুন, ২০২৬
মহারাষ্ট্রের পুনে জেলার ঐতিহাসিক লোহাগড় দুর্গে বেড়াতে গিয়ে প্রাণ হারালেন ২৬ বছর বয়সি যুবক কেতন আগরওয়াল। প্রথমে ঘটনাটি দুর্ঘটনা বলে মনে হলেও তদন্তের অগ্রগতিতে সামনে এসেছে এক শিউরে ওঠার মতো অভিযোগ। পুলিশের দাবি, কেতনকে পাহাড়ের খাদে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়ার পরিকল্পনায় জড়িত ছিলেন তাঁর বাগদত্তা সিয়া গোয়েল এবং সিয়ার প্রেমিক চেতন চৌধুরী।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে শুধু পুনে নয়, গোটা দেশজুড়ে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। কারণ কয়েক মাস পরেই জাঁকজমকপূর্ণ বিয়ের প্রস্তুতি চলছিল দুই পরিবারের মধ্যে। আত্মীয়-স্বজনদের দাবি, সবকিছু স্বাভাবিক দেখালেও পর্দার আড়ালে চলছিল এক জটিল প্রেমের সম্পর্ক, যার পরিণতি হলো মর্মান্তিক মৃত্যু।
কীভাবে ঘটল ঘটনাটি?
পরিবার সূত্রে জানা যায়, কেতন ও সিয়ার বাগদান হয়েছিল চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে। আগামী নভেম্বরে তাদের বিয়ের দিনও নির্ধারিত ছিল। বিয়ের প্রস্তুতিতে দুই পরিবারই ব্যস্ত ছিল।
১৮ জুন, নিজের জন্মদিনের আগের দিন সিয়া নাকি লোহাগড় দুর্গে ট্রেকিংয়ে যাওয়ার প্রস্তাব দেন। কেতন সেই প্রস্তাবে রাজি হন। পরে সিয়া, কেতন এবং চেতন পাহাড়ি এলাকায় যান।
প্রথমে দাবি করা হয়, ছবি তুলতে গিয়ে পা পিছলে খাদে পড়ে যান কেতন। কিন্তু তদন্তে পুলিশের সন্দেহ বাড়তে থাকে। দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর অভিযোগ ওঠে, কেতনকে একটি ভারী বস্তু দিয়ে আঘাত করে খাদে ফেলে দেওয়া হয়েছিল।
পরিবারের অভিযোগ
কেতনের বাবা বিষাল আগরওয়াল সংবাদমাধ্যমকে জানান, শুরুতে তারা ঘটনাটিকে দুর্ঘটনা বলেই ভেবেছিলেন। কিন্তু পরে কিছু আচরণ তাদের সন্দেহ জাগায়।
তাঁর কথায়, “যদি বিয়ে করতে না চাইত, তাহলে সরাসরি না বলতে পারত। আমরা বিয়ে বাতিল করে দিতাম। কিন্তু এমন নির্মম সিদ্ধান্ত কেন নেওয়া হলো?”
তিনি আরও দাবি করেন, কেতনের দেহ উদ্ধার হওয়ার পরও সিয়ার মুখে কোনো শোকের ছাপ দেখা যায়নি, যা পরিবারের সন্দেহ আরও বাড়িয়ে দেয়।
প্রেমের সম্পর্ক জানত পরিবার?
কেতনের দাদুর অভিযোগ, সিয়ার পরিবারের কিছু সদস্য আগে থেকেই তাঁর প্রেমের সম্পর্কের কথা জানতেন।
পরিবারের দাবি, দীর্ঘদিনের পরিচিত হওয়া সত্ত্বেও এই তথ্য গোপন রাখা হয়েছিল। যদি আগে সব জানা যেত, তাহলে হয়তো এই সম্পর্ক আর বিয়ের প্রস্তুতি এতদূর এগোত না।
কোটি টাকার বিয়ের প্রস্তুতি
ঘটনার আরও একটি বিস্ময়কর দিক হলো বিয়ের আয়োজন।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে—
- রাজস্থানে জাঁকজমকপূর্ণ বিয়ের পরিকল্পনা ছিল।
- একটি রাজপ্রাসাদ বুকিংয়ের জন্য কোটি কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছিল।
- অতিথিদের জন্য বিশেষ বিমানের ব্যবস্থাও করা হচ্ছিল।
- দুই পরিবারই বিয়ে নিয়ে অত্যন্ত উৎসাহিত ছিল।
এই অবস্থায় এমন মর্মান্তিক ঘটনার খবর আত্মীয়-স্বজনদের কাছে ছিল সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত।
পুলিশের তদন্তে কী জানা গেছে?
তদন্তকারীদের দাবি, অভিযুক্ত দুই ব্যক্তি জিজ্ঞাসাবাদে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন।
পুলিশ সূত্রের মতে—
- ঘটনাস্থল থেকে বিভিন্ন প্রমাণ সংগ্রহ করা হয়েছে।
- মোবাইল ফোনের তথ্য এবং কল রেকর্ড খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
- ঘটনার আগে ও পরে অভিযুক্তদের গতিবিধি বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
- হত্যার পরিকল্পনা আগে থেকেই করা হয়েছিল কি না, তা তদন্তের অন্যতম প্রধান বিষয়।
তবে মামলাটি এখনও বিচারাধীন হওয়ায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আদালতের ওপরই নির্ভর করবে।
সমাজের জন্য বড় প্রশ্ন
এই ঘটনা আবারও সামনে এনে দিয়েছে সম্পর্কের ক্ষেত্রে সততা ও স্পষ্টতার গুরুত্ব।
বিশেষজ্ঞদের মতে—
- বিয়ের আগে পারস্পরিক সম্মতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
- সম্পর্ক নিয়ে দ্বিধা থাকলে তা শুরুতেই জানানো উচিত।
- পারিবারিক বা সামাজিক চাপের কারণে ভুল সিদ্ধান্তের পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে।
- মানসিক দ্বন্দ্ব বা সম্পর্কগত সমস্যা থাকলে কাউন্সেলিংয়ের সাহায্য নেওয়া উচিত।
লোহাগড় দুর্গ: পর্যটনের কেন্দ্র থেকে অপরাধের আলোচনায়
Lohagad Fort মহারাষ্ট্রের অন্যতম জনপ্রিয় ঐতিহাসিক দুর্গ। প্রতিবছর হাজার হাজার পর্যটক ও ট্রেকার এখানে আসেন। মনোরম পাহাড়ি পরিবেশ, প্রাচীন স্থাপত্য এবং দুর্গম পথের জন্য এটি বিখ্যাত।
কিন্তু সাম্প্রতিক এই ঘটনায় পর্যটন কেন্দ্রটি এখন অপরাধ তদন্তের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
একদিকে স্বপ্নের বিয়ের প্রস্তুতি, অন্যদিকে গোপন প্রেমের সম্পর্ক— এই দুইয়ের সংঘর্ষে হারিয়ে গেল এক তরুণ প্রাণ। কেতন আগরওয়ালের মৃত্যু শুধু একটি ফৌজদারি মামলাই নয়, এটি সম্পর্কের স্বচ্ছতা, বিশ্বাস এবং মানবিক মূল্যবোধ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
আদালতের রায়ই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে অভিযুক্তদের ভবিষ্যৎ। তবে এই ঘটনায় শোকস্তব্ধ পরিবারগুলোর কাছে কোনো রায়ই হয়তো প্রিয়জনকে ফিরিয়ে দিতে পারবে না।
