the top india survey news, ,thetopindia
বলিউডের ঝলকানির আড়ালে অন্ধকার বাস্তবতা! আয়ের ৫০-৬০% কমে বিপাকে হাজারো টেকনিশিয়ান
ভারতের সিনেমা জগৎ মানেই রঙিন আলো, কোটি টাকার ব্যবসা, সুপারস্টারদের বিলাসবহুল জীবন আর বক্স অফিসে নতুন রেকর্ড। সম্প্রতি মুক্তিপ্রাপ্ত বড় বাজেটের ছবি ‘ধুরন্ধর: দ্য রিভেঞ্জ’ এবং ‘ছাভা’ বিপুল সাফল্য পাওয়ার পর আবারও মনে হচ্ছিল বলিউড যেন তার পুরনো জৌলুস ফিরে পেয়েছে। কিন্তু ক্যামেরার সামনের এই চাকচিক্যের পিছনে লুকিয়ে রয়েছে এক গভীর সংকটের গল্প।
সাম্প্রতিক এক সমীক্ষা বলছে, বলিউডের অফ-ক্যামেরা কর্মীদের জীবনে নেমে এসেছে বড় আর্থিক বিপর্যয়। সহকারী পরিচালক, লাইটম্যান, মেকআপ আর্টিস্ট, এডিটর, ক্যামেরা অপারেটর থেকে শুরু করে স্পটবয়— অনেকের আয় গত কয়েক বছরে ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গিয়েছে। অথচ তারকারা এখনও কোটি কোটি টাকার পারিশ্রমিক নিচ্ছেন। এই বৈপরীত্য এখন নতুন করে প্রশ্ন তুলছে বলিউডের বাস্তব পরিস্থিতি নিয়ে।
সমীক্ষায় উঠে এল উদ্বেগজনক ছবি
একটি সাম্প্রতিক শিল্প সমীক্ষায় প্রায় এক হাজারেরও বেশি বিনোদন জগতের কর্মীদের সঙ্গে কথা বলা হয়। সেখানে উঠে আসে এক ভয়ঙ্কর বাস্তবতা। বহু কর্মী জানিয়েছেন, আগের মতো নিয়মিত কাজ আর মিলছে না। এক সময় বছরে একাধিক সিনেমা, ওয়েব সিরিজ বা বিজ্ঞাপনের শুটিংয়ে কাজ থাকলেও এখন দীর্ঘ সময় বসে থাকতে হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতির পিছনে রয়েছে একাধিক কারণ—
- প্রযোজনার বাজেট কমে যাওয়া
- OTT প্ল্যাটফর্মগুলির সতর্ক বিনিয়োগ
- নতুন প্রজেক্ট অনুমোদনে দীর্ঘ দেরি
- বিজ্ঞাপনের বাজারে মন্দা
- বড় তারকাদের অতিরিক্ত পারিশ্রমিক
ফলে প্রথম আঘাত পড়ছে সেই সমস্ত কর্মীদের উপর, যারা ক্যামেরার পিছনে থেকে সিনেমাকে সফল করে তোলেন।
কারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত?
সমীক্ষা অনুযায়ী সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছেন—
- সহকারী পরিচালক
- মেকআপ আর্টিস্ট
- জুনিয়র আর্টিস্ট
- লাইটম্যান
- ক্যামেরা অপারেটর
- এডিটর
- স্পট স্টাফ
- প্রোডাকশন অ্যাসিস্ট্যান্ট
- অভিনেতাদের ব্যক্তিগত জিম ট্রেনার
এমনকি ক্যামেরা ভাড়া সংস্থা, গাড়ি সরবরাহকারী এবং শুটিং সরঞ্জাম ব্যবসায়ীরাও বড় ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
কারণ বলিউডের অধিকাংশ কাজই ফ্রিল্যান্স ভিত্তিক। এখানে নির্দিষ্ট মাসিক বেতন নেই। একটি সিনেমা বা সিরিজের কাজ শেষ হলেই নতুন প্রজেক্টের অপেক্ষায় থাকতে হয়। তাই শুটিং বন্ধ মানেই আয় বন্ধ।
“আগে মাসে তিনটে কাজ পেতাম, এখন একটা কাজও মেলে না”
মুম্বইয়ের এক সহকারী পরিচালক জানিয়েছেন, কয়েক বছর আগেও তিনি মাসে অন্তত তিনটি প্রজেক্টে কাজ করতেন। এখন দুই-তিন মাসে একটি কাজও জোটে না। অনেক ক্ষেত্রেই পারিশ্রমিক আগের তুলনায় অনেক কম।
একজন মেকআপ আর্টিস্ট বলেন,
“তারকারা এখনও বিলাসবহুল ভ্যানিটি ভ্যানে আসেন, কিন্তু আমাদের পারিশ্রমিক নিয়ে দরাদরি করা হয়।”
এই বক্তব্যই যেন বলিউডের বর্তমান বাস্তবতাকে স্পষ্ট করে দেয়।
মুম্বইয়ে বাড়িভাড়া এখন সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা
বলিউডের মূল কাজকর্ম আবর্তিত হয় মুম্বইয়ের আন্ধেরি, জুহু এবং বান্দ্রা এলাকাকে ঘিরে। এখানেই রয়েছে অধিকাংশ স্টুডিও, প্রোডাকশন অফিস ও কাস্টিং এজেন্সি। ফলে কাজের সুবিধার জন্য বহু কর্মীকেই এই এলাকাগুলির আশেপাশে থাকতে হয়।
কিন্তু বর্তমানে এই অঞ্চলে ছোট ফ্ল্যাটের ভাড়াও মাসে প্রায় ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছে। আয় কমে যাওয়ার ফলে সেই ভাড়া দেওয়াই এখন অনেকের কাছে অসম্ভব হয়ে উঠেছে।
অনেক কর্মী বাধ্য হয়ে—
- সঞ্চয় ভাঙছেন
- আত্মীয় বা বন্ধুদের কাছ থেকে ধার নিচ্ছেন
- পার্ট টাইম কাজ করছেন
- কেউ কেউ মুম্বই ছেড়ে নিজের শহরে ফিরে যাচ্ছেন
OTT কি বদলে দিল বলিউডের অর্থনীতি?
এক সময় মনে করা হচ্ছিল OTT প্ল্যাটফর্মের উত্থান বিনোদন জগতের কর্মসংস্থান বাড়াবে। কিন্তু এখন পরিস্থিতি উল্টো দিকে যাচ্ছে বলেই দাবি করছেন অনেক বিশেষজ্ঞ।
কোভিড পরবর্তী সময়ে OTT প্ল্যাটফর্মগুলি বিপুল বিনিয়োগ করলেও বর্তমানে তারা অনেক বেশি সতর্ক। নতুন সিরিজ বা সিনেমা অনুমোদনে সময় নিচ্ছে। ফলে কাজের গতি কমে গিয়েছে।
তার উপর দর্শকদের রুচিতেও পরিবর্তন এসেছে। বড় বাজেটের সব ছবি আর সফল হচ্ছে না। ফলে প্রযোজকরা ঝুঁকি কমাতে চাইছেন।
তারকাদের কোটি টাকার পারিশ্রমিক নিয়ে প্রশ্ন
এই পরিস্থিতিতে আবারও সামনে এসেছে বলিউড তারকাদের বিশাল পারিশ্রমিকের প্রসঙ্গ। অনেক প্রযোজক মনে করছেন, ছবির বাজেটের বড় অংশ তারকাদের পারিশ্রমিকে চলে যাওয়ায় টেকনিক্যাল টিমের উপর খরচ কমানো হচ্ছে।
ফলে জুনিয়র ও মিড-লেভেলের কর্মীদের আয় সবচেয়ে বেশি কমছে।
কয়েকজন চলচ্চিত্র বিশ্লেষক মনে করছেন, যদি শিল্পের এই আর্থিক কাঠামো বদলানো না যায়, তাহলে আগামী দিনে দক্ষ কর্মীর অভাব তৈরি হতে পারে।
গ্ল্যামারের পিছনে অনিশ্চয়তার জীবন
সাধারণ মানুষ বলিউডকে দেখেন বিলাসিতা আর তারকাখ্যাতির দুনিয়া হিসেবে। কিন্তু বাস্তবে এই শিল্পের একটি বড় অংশ অনিশ্চয়তার উপর দাঁড়িয়ে।
একটি সিনেমা সফল হলে কেবল অভিনেতা বা পরিচালক নন, তার পিছনে শতাধিক মানুষের পরিশ্রম থাকে। অথচ সেই কর্মীরাই সবচেয়ে বেশি আর্থিক নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন।
কোনও স্থায়ী চাকরি নেই, স্বাস্থ্যবিমা নেই, ভবিষ্যতের সুরক্ষা নেই। ফলে কাজ কমে গেলেই জীবন থমকে যায়।
ভবিষ্যৎ নিয়ে এখনও আশাবাদী অনেকেই
তবে এত সংকটের মধ্যেও অনেকে আশাবাদী। তাদের মতে, আগামী কয়েক মাসে নতুন প্রজেক্ট শুরু হলে পরিস্থিতি কিছুটা বদলাতে পারে। বড় প্রযোজনা সংস্থাগুলিও ধীরে ধীরে নতুন পরিকল্পনা করছে।
কিন্তু এই সংকট বলিউডকে একটি বড় শিক্ষা দিয়েছে— শুধুমাত্র তারকাখ্যাতি দিয়ে শিল্প টিকে থাকতে পারে না। ক্যামেরার পিছনের মানুষদের সুরক্ষা ও সম্মান নিশ্চিত করাও সমান জরুরি।
বলিউডের নতুন বাস্তবতা
আজকের বলিউডে একদিকে রয়েছে শতকোটি টাকার ব্যবসা, অন্যদিকে হাজার হাজার কর্মীর অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। এই বৈপরীত্যই এখন সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয়।
ঝলমলে প্রিমিয়ার, রেড কার্পেট আর সোশ্যাল মিডিয়ার ভাইরাল ভিডিওর পিছনে লুকিয়ে আছে অসংখ্য সংগ্রামের গল্প। আর সেই গল্পই এবার সামনে এনে দিল সাম্প্রতিক এই সমীক্ষা।
বলিউডের গ্ল্যামারের আলো যতই উজ্জ্বল হোক না কেন, সেই আলোকে জ্বালিয়ে রাখার জন্য যারা দিনরাত পরিশ্রম করেন, তাদের জীবনেও যে আলো পৌঁছানো জরুরি— সেই বার্তাই যেন আরও একবার সামনে এল।

