Babar azam
বাবর আজম
পাকিস্তান ক্রিকেটের অন্যতম বড় তারকা বাবর আজমকে ঘিরে আবারও ক্রিকেটপ্রেমীদের আগ্রহ তুঙ্গে। দীর্ঘ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে কখনও তাঁর ব্যাটিং নিয়ে প্রশংসা হয়েছে, কখনও আবার খারাপ ফর্ম ও চাপের কারণে উঠেছে প্রশ্ন। কিন্তু একটি বিষয় নিয়ে খুব বেশি বিতর্ক নেই—আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিজের প্রজন্মের অন্যতম ধারাবাহিক ও দক্ষ ব্যাটার হিসেবে বাবর ইতিমধ্যেই নিজের জায়গা তৈরি করেছেন।
২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাবর টেস্টে ৬৫টি, ওয়ানডেতে ১৪৩টি এবং আন্তর্জাতিক টি-২০তে ১৪৪টি ম্যাচ খেলেছেন। তাঁর টেস্টে সর্বোচ্চ স্কোর ১৯৬, ওয়ানডেতে ১৫৮ এবং টি-২০ আন্তর্জাতিকে ১২২ রান। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তাঁর শতকের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য—টেস্টে ৯টি, ওয়ানডেতে ২০টি এবং টি-২০ আন্তর্জাতিকে ৩টি। (mykhel.com)
বাবরের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পথচলা
লাহোরে জন্ম নেওয়া বাবর আজম ছোটবেলা থেকেই ক্রিকেটের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে আসার আগে বয়সভিত্তিক ক্রিকেটে দীর্ঘ প্রস্তুতি ছিল। ২০০৮ সালের Under-15 World Championship-এ তাঁর যাত্রা শুরু হয় এবং পরে ২০১০ ও ২০১২ সালের অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপেও তিনি পাকিস্তানের হয়ে খেলেন। (Cloudinary)
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তাঁর প্রথম বড় পদক্ষেপ আসে ২০১৫ সালে। ৩১ মে ২০১৫ সালে জিম্বাবোয়ের বিরুদ্ধে লাহোরের গাদ্দাফি স্টেডিয়ামে ওয়ানডে অভিষেক হয় বাবরের। অভিষেকেই ৬০ বলে ৫৪ রান করে তিনি বুঝিয়ে দিয়েছিলেন যে বড় মঞ্চের চাপ সামলানোর ক্ষমতা তাঁর রয়েছে। (icc)
এরপর ধীরে ধীরে পাকিস্তানের ব্যাটিংয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হয়ে ওঠেন তিনি।
ওয়ানডেতে বাবরের শতকের ইতিহাস
বাবর আজমের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অধ্যায়গুলোর একটি তাঁর ওয়ানডে শতকের ইতিহাস। ২০১৬ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে টানা তিনটি ওয়ানডে শতক করে তিনি ক্রিকেটবিশ্বের নজর কাড়েন। সেই সময় তাঁর ব্যাটিংয়ের ধারাবাহিকতা এতটাই অসাধারণ ছিল যে মাত্র ২১ ইনিংসে ১,০০০ ওয়ানডে রান পূর্ণ করেছিলেন তিনি—তখনকার সময়ে এটি ছিল বিশ্বরেকর্ডের সমান। (Cloudinary)
২০১৬ সালের শেষ দিকে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সেই ধারাবাহিক শতকের পর থেকেই বাবরকে পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ তারকা হিসেবে দেখা শুরু হয়। ২০১৭ সালেও তিনি দুর্দান্ত ব্যাটিং চালিয়ে যান। চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির পর শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে পরপর দুটি শতক করেন। সংযুক্ত আরব আমিরাতে টানা পাঁচটি ওয়ানডে ইনিংসে শতক করার নজিরও তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম স্মরণীয় অধ্যায়। (icc)
২০২৩ সালে নেপালের বিরুদ্ধে এশিয়া কাপে ১৫১ রানের দুর্দান্ত ইনিংস খেলেন বাবর। সেই ম্যাচে তিনি ১৯তম ওয়ানডে শতকে পৌঁছন এবং মাত্র ১০২ ইনিংসে ১৯টি ওয়ানডে শতক করার মাইলফলক গড়েন। (icc)
বর্তমানে তাঁর ওয়ানডে ক্যারিয়ারে ২০টি শতক রয়েছে এবং সর্বোচ্চ স্কোর ১৫৮ রান, যা তিনি ২০২১ সালে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে করেছিলেন। (cricbuzz.com)
টেস্ট ক্রিকেটেও নিজেকে প্রমাণ করেছেন
অনেকে বাবরকে শুধু সীমিত ওভারের ব্যাটার হিসেবে দেখলেও টেস্ট ক্রিকেটে তাঁর পারফরম্যান্সও গুরুত্বপূর্ণ। ২০১৬ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে টেস্ট অভিষেক হয় তাঁর।
টেস্টে তাঁর সর্বোচ্চ স্কোর ১৯৬ রান। এই ইনিংসটি অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে করাচিতে ২০২২ সালের ঐতিহাসিক টেস্টে এসেছিল। দীর্ঘ সময় ক্রিজে থেকে, নতুন বল সামলে এবং পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে ব্যাট করার ক্ষমতা সেই ইনিংসে স্পষ্ট হয়েছিল।
২০২২ সালের পর টেস্টে তাঁর ফর্ম নিয়ে কিছুটা প্রশ্ন উঠলেও ২০২৬ সালে আবারও তিনি ধারাবাহিকতার ইঙ্গিত দিয়েছেন। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক টেস্ট সিরিজে ১৯৩ রান করে পাকিস্তানের হয়ে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক হন তিনি; সেখানে দুটি অর্ধশতক ছিল। (icc)
এরপর ২০২৬ সালের আগস্টে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে লর্ডস টেস্টেও তিনি খেলেছেন। (cricbuzz.com)
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাবরের সবচেয়ে বড় স্কোরগুলো
বাবর আজমের তিন ফরম্যাটের সর্বোচ্চ আন্তর্জাতিক স্কোরের দিকে তাকালে তাঁর ব্যাটিংয়ের বৈচিত্র্য বোঝা যায়।
টেস্ট: ১৯৬ রান — অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে
ওয়ানডে: ১৫৮ রান — ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে
টি-২০ আন্তর্জাতিক: ১২২ রান — দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে
টি-২০ ক্রিকেটে ২০২১ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে ৫৯ বলে ১২২ রানের ইনিংসটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এর মাধ্যমে তিনি দেখিয়েছিলেন যে প্রয়োজন হলে তাঁর ব্যাটিংয়ের গতি অনেকটাই বাড়াতে পারেন। ICC-র তথ্য অনুযায়ী, মাত্র ১৮টি ম্যাচের মধ্যে তিনি টি-২০ আন্তর্জাতিক ব্যাটিং র্যাঙ্কিংয়ের এক নম্বর স্থানেও পৌঁছেছিলেন। (Cloudinary)
কীভাবে বাবর ‘কমপ্লিট ব্যাটার’ হয়ে উঠলেন?
বাবর আজমের ব্যাটিংয়ের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো তাঁর টেকনিক ও টাইমিং। তিনি সাধারণত অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকি কম নেন। বিশেষ করে অফসাইডে তাঁর কভার ড্রাইভ দীর্ঘদিন ধরে বিশ্ব ক্রিকেটে আলোচিত।
কিন্তু শুধু সুন্দর শট খেলাই তাঁকে বড় ব্যাটার বানায়নি। বয়সভিত্তিক ক্রিকেট, ঘরোয়া ক্রিকেট এবং আন্তর্জাতিক ক্রিকেট—প্রতিটি স্তরে ধীরে ধীরে অভিজ্ঞতা অর্জন তাঁর ব্যাটিংকে পরিণত করেছে।
ICC-র একটি ক্যারিয়ার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে আসার আগে বাবর ঘরোয়া ক্রিকেটে দীর্ঘ সময় কাটিয়েছিলেন। ২০১৪-১৫ মৌসুমে ১১টি List A ম্যাচে ৫৭১ রান করেছিলেন, গড় ছিল ৬৩.৪৪ এবং তিনটি শতক ছিল তাঁর ব্যাটে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ঢোকার আগেই তাঁর ছয়টি শতক ও ২,০০০-এর বেশি List A রান ছিল। (icc)
এই দীর্ঘ প্রস্তুতিই তাঁকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের চাপ সামলাতে সাহায্য করেছে।
শুধু শট নয়, পরিস্থিতি বোঝার ক্ষমতাও তাঁর শক্তি
একজন সম্পূর্ণ ব্যাটারের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো ম্যাচের পরিস্থিতি অনুযায়ী নিজের ব্যাটিং বদলে নেওয়া। বাবরের ক্যারিয়ারে এর বহু উদাহরণ রয়েছে।
ওয়ানডেতে যখন দ্রুত রান প্রয়োজন, তখন তিনি স্ট্রাইক রোটেট করতে পারেন এবং বাউন্ডারি বের করতে পারেন। আবার টেস্টে একই ব্যাটারকে দেখা যায় ধৈর্য ধরে কয়েক ঘণ্টা ব্যাট করতে।
টি-২০ ক্রিকেটে তাঁর ১২২ রানের ইনিংস প্রমাণ করে যে প্রয়োজন হলে তিনি আক্রমণাত্মক ক্রিকেটও খেলতে পারেন। অন্যদিকে টেস্টের ১৯৬ তাঁর দীর্ঘ সময় ধরে উইকেটে থাকার ক্ষমতার প্রমাণ।
এই তিন ধরনের দক্ষতার সমন্বয়ই তাঁকে পাকিস্তানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যাটারে পরিণত করেছে।
বাবরের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ
তবে বাবরের ক্যারিয়ার এখন এমন একটি পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে শুধু অতীতের রেকর্ড দিয়ে সমালোচনা থামানো সম্ভব নয়। ২০২৬ সালে তাঁর ওপর প্রত্যাশা অনেক বেশি। পাকিস্তানের ব্যাটিং লাইনআপে তাঁর অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ।
ICC-র আগস্ট ২০২৬-এর আপডেট অনুযায়ী, ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে ৮৮ ও অপরাজিত ২৪ রানের ইনিংসের পর তিনি আবার টেস্ট ব্যাটিং র্যাঙ্কিংয়ের সেরা দশে ফিরে এসেছিলেন। এর আগে ২০২২ সালে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ঘরের মাঠে তাঁর ক্যারিয়ার-সেরা টেস্ট র্যাঙ্কিং ছিল দ্বিতীয়। (icc)
অর্থাৎ, ওঠানামা থাকলেও বাবর এখনও বিশ্বমানের ব্যাটারদের আলোচনায় রয়েছেন।
বাবর আজমের শতকের উত্তরাধিকার
ওয়ানডেতে ২০টি শতক, টেস্টে ৯টি এবং টি-২০ আন্তর্জাতিকে ৩টি—এই পরিসংখ্যান দেখায় যে বাবর শুধু একটি ফরম্যাটের ব্যাটার নন। (cricbuzz.com)
তাঁর ক্যারিয়ার এখনও শেষ হয়নি। সামনে আরও ম্যাচ রয়েছে, আরও শতক করার সুযোগ রয়েছে এবং পাকিস্তানের হয়ে আরও অনেক রেকর্ড গড়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বাবর আজমের গল্প শুধুমাত্র রান ও শতকের গল্প নয়। এটি একজন তরুণ ক্রিকেটারের বয়সভিত্তিক ক্রিকেট থেকে উঠে এসে ঘরোয়া ক্রিকেটে নিজেকে তৈরি করা, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের চাপ সামলানো, তিন ফরম্যাটে নিজের ব্যাটিংকে মানিয়ে নেওয়া এবং সময়ের সঙ্গে একজন পরিণত ব্যাটারে পরিণত হওয়ার গল্প।
তাই আজও যখন বাবর ক্রিজে নামেন, ক্রিকেটপ্রেমীদের চোখ থাকে তাঁর ব্যাটের দিকে। একটি কভার ড্রাইভ, একটি দীর্ঘ ইনিংস কিংবা একটি শতক—যেকোনও মুহূর্তেই তিনি ম্যাচের গল্প বদলে দিতে পারেন। আর সেই কারণেই পাকিস্তান ক্রিকেটে বাবর আজমকে ঘিরে আগ্রহ এখনও এতটা প্রবল।