Babar Azam
Babar Azam
বাবর আজম: আধুনিক পাকিস্তান ক্রিকেটের ব্যাটে লেখা এক অধ্যায়
পাকিস্তান ক্রিকেট মানেই অপ্রত্যাশিত প্রতিভা, আবেগে ভরা পারফরম্যান্স আর ইতিহাস গড়া ব্যাটসম্যানদের গল্প। সেই ধারাবাহিকতার আধুনিক প্রতিনিধি হলেন মুহাম্মাদ বাবর আজম—একজন ক্রিকেটার, যিনি শুধুমাত্র রান করেন না, বরং নিজের ব্যাট দিয়ে একটি প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করেন। ২০২০ সাল থেকে ২০২৩ সালের ১৫ নভেম্বর পর্যন্ত ক্রিকেটের তিন ফরম্যাটেই পাকিস্তান জাতীয় দলের অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা বাবর আজম আজকের দিনে পাকিস্তান ক্রিকেটের সসবচেয়
Babar Azam
শৈশব ও ক্রিকেটের প্রতি ভালোবাসা
১৯৯৪ সালের ১৫ অক্টোবর পাকিস্তানের লাহোর শহরে জন্মগ্রহণ করেন মুহাম্মাদ বাবর আজম। ক্রিকেট ছিল তাঁর রক্তে—কারণ তাঁর চাচাতো ভাই কামরান আকমল ও উমর আকমল পাকিস্তান জাতীয় দলের পরিচিত মুখ। তবে পারিবারিক পরিচয় থাকলেও বাবর আজম নিজের জায়গা তৈরি করেছেন কঠোর পরিশ্রম ও শৃঙ্খলার মাধ্যমে।
শৈশব থেকেই বাবরের ক্রিকেটের প্রতি ঝোঁক ছিল প্রবল। লাহোরের গলিপথে টেনিস বল নিয়ে খেলা থেকে শুরু করে পরে হার্ড বল ক্রিকেট—সব পর্যায়েই তাঁর ব্যাটিংয়ে ছিল স্বচ্ছন্দতা ও আত্মবিশ্বাস। পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের (PCB) অনূর্ধ্ব-১৯ একাডেমিতে ভর্তি হওয়ার পর তাঁর প্রতিভা ধীরে ধীরে নজরে আসে নির্বাচকদের।
অনূর্ধ্ব-১৯ ক্রিকেট ও ভবিষ্যৎ তারকার ইঙ্গিত
বাবর আজম পাকিস্তান অনূর্ধ্ব-১৯ দলের হয়ে ২০১০ ও ২০১২ সালের যুব বিশ্বকাপে অংশ নেন। যদিও দলগত সাফল্য খুব বড় কিছু ছিল না, কিন্তু ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সে বাবর ধারাবাহিকতা দেখান।
এই সময়েই বোঝা যাচ্ছিল—তিনি শুধুই আক্রমণাত্মক ব্যাটসম্যান নন, বরং একজন টেকনিক্যালি পরিপূর্ণ ক্রিকেটার। অফ স্টাম্পের বাইরে বল ছাড়া, সঠিক টাইমিং ও মসৃণ স্ট্রোক—এই বৈশিষ্ট্যগুলো তাঁকে আলাদা করে তোলে।
আন্তর্জাতিক অভিষেক ও শুরুর সংগ্রাম
২০১৫ সালে জিম্বাবুয়ের বিরুদ্ধে ওয়ানডে ক্রিকেটে বাবর আজমের আন্তর্জাতিক অভিষেক হয়। শুরুটা খুব সহজ ছিল না। প্রথম কয়েকটি ম্যাচে বড় রান না পেলেও নির্বাচকরা তাঁর ওপর আস্থা রাখেন।
এরপর ধীরে ধীরে তিনি নিজের ছন্দ খুঁজে পান। ২০১৬ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে টেস্ট অভিষেক এবং একই বছরে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে অভিষেক—সব ফরম্যাটেই বাবর নিজেকে মানিয়ে নিতে থাকেন।
Babar Azam
ব্যাটিং স্টাইল: ক্লাস আর ধারাবাহিকতার মেলবন্ধন
বাবর আজমের ব্যাটিং মানেই ক্লাসিক্যাল স্টাইল। তিনি ডানহাতি টপ-অর্ডার ব্যাটসম্যান, যাঁর ব্যাটিংয়ে রয়েছে—
- নিখুঁত ফুটওয়ার্ক
- দুর্দান্ত কভার ড্রাইভ
- মিড উইকেটে সুন্দর ফ্লিক
- স্পিন ও পেস—দু’ধরনের বোলিংয়ের বিরুদ্ধেই দক্ষতা
তিনি অযথা ঝুঁকি নেন না। পরিস্থিতি বুঝে খেলেন। তাই তিন ফরম্যাটেই তাঁর গড় চোখে পড়ার মতো।
তিন ফরম্যাটেই সেরা হওয়ার বিরল কৃতিত্ব
আধুনিক ক্রিকেটে তিন ফরম্যাটেই সমানভাবে সফল হওয়া খুব কঠিন। কিন্তু বাবর আজম সেই বিরল তালিকায় নিজের নাম লিখিয়েছেন।
এক সময় এমনও হয়েছে, যখন তিনি—
- ওয়ানডে ক্রিকেটে বিশ্বের ১ নম্বর ব্যাটসম্যান
- টি-টোয়েন্টিতে শীর্ষস্থানীয় ব্যাটসম্যান
- টেস্ট ক্রিকেটেও শীর্ষ ৫-এর মধ্যে
এই ধারাবাহিকতা তাঁকে সমসাময়িক সেরা ব্যাটসম্যানদের কাতারে নিয়ে গেছে—যেখানে রয়েছেন বিরাট কোহলি, জো রুট, কেন উইলিয়ামসনের মতো নাম।
অধিনায়ক বাবর আজম: প্রত্যাশা ও চাপ
২০২০ সালে বাবর আজম পাকিস্তান দলের পূর্ণকালীন অধিনায়ক নিযুক্ত হন। একসঙ্গে তিন ফরম্যাটের দায়িত্ব পাওয়া সহজ ছিল না। অধিনায়ক হিসেবে তাঁর সামনে ছিল বড় চ্যালেঞ্জ—
- তরুণ দলকে একসূত্রে গাঁথা
- বিদেশের মাটিতে পারফরম্যান্স উন্নত করা
- আইসিসি টুর্নামেন্টে ধারাবাহিক সাফল্য
তাঁর নেতৃত্বে পাকিস্তান দল ২০২১ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল এবং ২০২২ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ফাইনালে পৌঁছায়। যদিও ট্রফি জেতা সম্ভব হয়নি, তবে দল নতুন আত্মবিশ্বাস পায়।
সমালোচনা ও বিতর্ক
সাফল্যের সঙ্গে সঙ্গে সমালোচনাও এসেছে। অধিনায়ক হিসেবে কখনও কখনও তাঁর ফিল্ড সেটিং বা সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বড় ম্যাচে ব্যক্তিগত রান না পাওয়া নিয়েও সমালোচনা হয়েছে।
তবে বাবর আজম বরাবরই নীরবে নিজের কাজ করে গেছেন। সামাজিক মাধ্যমে খুব বেশি প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে মাঠের পারফরম্যান্স দিয়েই উত্তর দেওয়াই তাঁর স্বভাব।
অধিনায়কত্ব ছাড়া নতুন অধ্যায়
২০২৩ সালের ১৫ নভেম্বর বাবর আজম তিন ফরম্যাটের অধিনায়কত্ব থেকে সরে দাঁড়ান। এটি ছিল তাঁর ক্যারিয়ারের এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়। অনেকেই মনে করেন, অধিনায়কত্বের চাপ মুক্ত হয়ে তিনি আবার আগের মতো নির্ভার ব্যাটিং করতে পারবেন।
এই সিদ্ধান্তের পর বাবর আজমের সামনে নতুন সুযোগ—
- নিজের ব্যাটিংয়ে আরও মনোযোগ
- দীর্ঘ ক্যারিয়ারের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করা
- তরুণ ক্রিকেটারদের জন্য আদর্শ হয়ে ওঠা
ব্যক্তিত্ব ও মাঠের বাইরে বাবর
মাঠের বাইরে বাবর আজম অত্যন্ত শান্ত ও সংযত। বিলাসী জীবনযাপন বা বিতর্ক থেকে দূরে থাকাই তাঁর বৈশিষ্ট্য। তরুণদের কাছে তিনি শৃঙ্খলা, পরিশ্রম ও ধৈর্যের প্রতীক।
বিভিন্ন সামাজিক কাজ ও দাতব্য উদ্যোগেও তাঁকে যুক্ত থাকতে দেখা যায়, যা তাঁকে একজন দায়িত্বশীল ক্রীড়াবিদ হিসেবে তুলে ধরে।
ভবিষ্যৎ ও উত্তরাধিকার
বাবর আজমের ক্যারিয়ার এখনও শেষ হয়ে যায়নি। সামনে রয়েছে আরও বহু সিরিজ, বিশ্বকাপ ও রেকর্ড। পাকিস্তান ক্রিকেট ইতিহাসে তাঁর নাম ইতিমধ্যেই স্বর্ণাক্ষরে লেখা হয়ে গেছে।
ভবিষ্যতে হয়তো তাঁকে অধিনায়ক হিসেবে নয়, বরং একজন লিজেন্ড ব্যাটসম্যান হিসেবেই বেশি মনে রাখা হবে—যিনি কঠিন সময়ে পাকিস্তান ক্রিকেটকে স্থিতি ও বিশ্বাস দিয়েছেন
মুহাম্মাদ বাবর আজম শুধু একজন ক্রিকেটার নন, তিনি আধুনিক পাকিস্তান ক্রিকেটের এক প্রতিচ্ছবি। তাঁর ব্যাটে যেমন সৌন্দর্য আছে, তেমনই আছে দায়িত্ববোধ ও ধারাবাহিকতা। সমালোচনা, চাপ আর প্রত্যাশার মাঝেও যিনি নিজের পথে অবিচল থেকেছেন।
পাকিস্তান ক্রিকেট যতদিন থাকবে, বাবর আজমের নাম ততদিন শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হবে—একজন সত্যিকারের ক্লাসিক ব্যাটসম্যান হিসেবে।




Post Comment