জোড়া গোলে সেনেগালকে হারিয়ে বিশ্বকাপ অভিযান শুরু ফ্রান্সের, গড়লেন নতুন ইতিহাস Kylian Mbappe।
Kylian Mbappe
Kylian Mbappe
ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর গ্রুপ পর্বে অন্যতম আকর্ষণীয় ম্যাচ ছিল France National Football Team বনাম Senegal National Football Team। নিউ জার্সির ইস্ট রাদারফোর্ডে অনুষ্ঠিত এই ম্যাচে শেষ পর্যন্ত ৩-১ গোলের জয় তুলে নেয় ফ্রান্স। তবে ম্যাচের সবচেয়ে বড় গল্প ছিল একজনের—Kylian Mbappe। জোড়া গোল করে তিনি শুধু দলকে জেতাননি, ফ্রান্সের সর্বকালের সর্বোচ্চ আন্তর্জাতিক গোলদাতার রেকর্ডও নিজের নামে লিখে নিয়েছেন।
৮০ হাজারেরও বেশি দর্শকের উপস্থিতিতে ম্যাচটি শুরু হয়েছিল প্রচণ্ড উত্তেজনার মধ্য দিয়ে। বিশ্বকাপের অন্যতম ফেভারিট হিসেবে মাঠে নামলেও প্রথমার্ধে বেশ চাপে পড়ে যায় ফ্রান্স। সেনেগালের দ্রুতগতির আক্রমণ এবং সংগঠিত রক্ষণ ফরাসিদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
প্রথমার্ধে সেনেগালের দাপট
ম্যাচের শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে থাকে সেনেগাল। অধিনায়ক Sadio Mane সামনে থেকে দলকে নেতৃত্ব দেন। ২৫তম মিনিটে Nicolas Jackson দুর্দান্ত একটি সুযোগ তৈরি করেছিলেন। তিনি ফরাসি ডিফেন্স ভেঙে শট নেন, কিন্তু বল পোস্টে লেগে ফিরে আসে।
প্রথমার্ধের অতিরিক্ত সময়ে Ismaila Sarr গোল করার সুবর্ণ সুযোগ নষ্ট করেন। খালি জালে বল পাঠানোর সুযোগ থাকলেও তাঁর শট বার ঘেঁষে বাইরে চলে যায়। ফলে প্রথমার্ধ গোলশূন্য অবস্থায় শেষ হয়।
সেনেগাল প্রথম ৪৫ মিনিটে যেভাবে খেলেছিল, তাতে মনে হচ্ছিল ২০০২ বিশ্বকাপের সেই ঐতিহাসিক অঘটনের পুনরাবৃত্তি হতে পারে। সেই টুর্নামেন্টেও বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ফ্রান্সকে হারিয়েছিল সেনেগাল।
বিরতির পর বদলে যায় ম্যাচের চিত্র
দ্বিতীয়ার্ধ শুরু হওয়ার পর ফ্রান্সের কোচ Didier Deschamps কৌশলগত পরিবর্তন আনেন। তিনি Michael Olise-কে ডান প্রান্ত থেকে কেন্দ্রীয় ভূমিকায় নিয়ে আসেন।
এই সিদ্ধান্তই ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
ওলিসে একের পর এক সুযোগ তৈরি করতে থাকেন। তাঁর পাস, ড্রিবলিং এবং সৃজনশীলতা সেনেগালের রক্ষণকে ছিন্নভিন্ন করে দেয়। ফরাসি আক্রমণ হঠাৎ করেই অনেক বেশি ধারালো হয়ে ওঠে।
এমবাপ্পের প্রথম গোল: ইতিহাসের সূচনা
৬৬তম মিনিটে আসে ম্যাচের প্রথম গোল। মাইকেল ওলিসের অসাধারণ থ্রু পাস ধরে বক্সের ভেতরে ঢুকে পড়েন এমবাপ্পে। এরপর শান্ত মাথায় বল জালে জড়িয়ে দেন তিনি।
এই গোলের মাধ্যমে ফ্রান্স ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায় এবং ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়ে নেয়।
গোলের পর এমবাপ্পের উদযাপন ছিল দেখার মতো। পুরো স্টেডিয়াম যেন তাঁর নামেই মুখরিত হয়ে ওঠে।
বারকোলার গোল, জয়ের পথ আরও সহজ
ফ্রান্সের দ্বিতীয় গোল আসে ম্যাচের শেষ দিকে। মিডফিল্ডার Adrien Rabiot-এর নিখুঁত পাস ধরে বদলি খেলোয়াড় Bradley Barcola গোল করেন।
৮৮তম মিনিটে করা এই গোল কার্যত ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেয়। ফ্রান্স ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায় এবং সেনেগালের সামনে কাজ আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
সেনেগালের প্রত্যাবর্তনের চেষ্টা
ম্যাচের ৯৫তম মিনিটে সেনেগালের হয়ে একটি গোল শোধ করেন Ibrahim Mbaye।
এই গোলের পর কিছুটা উত্তেজনা তৈরি হলেও ফ্রান্স খুব দ্রুতই তার জবাব দেয়।
সেনেগালের সমর্থকেরা আশা করেছিলেন শেষ মুহূর্তে হয়তো নাটকীয় কিছু ঘটতে পারে, কিন্তু সেই আশা পূরণ হয়নি।
এমবাপ্পের বিস্ময়কর দ্বিতীয় গোল
ম্যাচের ৯৬তম মিনিটে বক্সের বাইরে থেকে দুর্দান্ত এক শটে বল জালে জড়িয়ে দেন এমবাপ্পে।
এই গোলটি শুধু ম্যাচ নিশ্চিত করেনি, বরং ইতিহাসও তৈরি করেছে।
দ্বিতীয় গোলের মাধ্যমে তাঁর আন্তর্জাতিক গোলসংখ্যা দাঁড়ায় ৫৮-তে, যা ফ্রান্সের ইতিহাসে সর্বোচ্চ।
পুরনো সব রেকর্ড ভেঙে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে যান তিনি।
বিশ্বকাপে এমবাপ্পের রেকর্ড
বিশ্বকাপে এমবাপ্পের গোলসংখ্যা এখন ১৪।
তিনি পেছনে ফেলেছেন কিংবদন্তি Pele-এর ১২ গোল এবং Lionel Messi-এর ১৩ গোলের রেকর্ড।
এছাড়া তিনি সমতায় পৌঁছে গেছেন Gerd Muller-এর সঙ্গে।
তাঁর সামনে এখন রয়েছেন মাত্র দুজন কিংবদন্তি—
- Ronaldo Nazario – ১৫ গোল
- Miroslav Klose – ১৬ গোল
মাত্র দুই গোল দূরে রয়েছেন সর্বকালের সর্বোচ্চ বিশ্বকাপ গোলদাতার রেকর্ড থেকে।
ম্যাচের সেরা খেলোয়াড়
যদিও এমবাপ্পে দুই গোল করেছেন, তবুও মাইকেল ওলিসের অবদান ছিল অসাধারণ।
তিনি ম্যাচে:
- ১টি অ্যাসিস্ট করেন
- একাধিক সুযোগ তৈরি করেন
- সেনেগালের রক্ষণে ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করেন
- ম্যাচের গতি পরিবর্তনে মূল ভূমিকা পালন করেন
অনেক ফুটবল বিশ্লেষকের মতে, ওলিসে এবং এমবাপ্পের জুটি বিশ্বকাপের অন্যতম ভয়ংকর আক্রমণভাগ হয়ে উঠতে পারে।
ফ্রান্সের সম্ভাবনা কতটা?
দুইবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ফ্রান্সকে টুর্নামেন্টের অন্যতম ফেভারিট ধরা হচ্ছে।
এমবাপ্পে, ওলিসে, বারকোলা, রাবিও এবং Ousmane Dembele-দের নিয়ে গড়া এই দলটি আক্রমণ ও রক্ষণ—দুই বিভাগেই ভারসাম্যপূর্ণ।
কোচ দেশঁ ইতোমধ্যেই জানিয়েছেন, দলকে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী হতে দিতে চান না। কারণ বিশ্বকাপে ছোট ভুলও বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে।
পরবর্তী ম্যাচ
এই জয়ের ফলে গ্রুপে গুরুত্বপূর্ণ তিন পয়েন্ট সংগ্রহ করেছে ফ্রান্স।
পরবর্তী ম্যাচে তাদের প্রতিপক্ষ হবে Iraq National Football Team। এরপর অপেক্ষা করছে Norway National Football Team-এর বিরুদ্ধে হাইভোল্টেজ লড়াই, যেখানে মুখোমুখি হতে পারেন এমবাপ্পে ও Erling Haaland।
ফ্রান্সের বিশ্বকাপ যাত্রা শুরু হলো জয় দিয়ে, কিন্তু এই ম্যাচ চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে কিলিয়ান এমবাপ্পের জন্য। জোড়া গোল করে তিনি শুধু দলকে জয় উপহার দেননি, নিজের নামও ফরাসি ফুটবলের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লিখে ফেলেছেন।
বিশ্বকাপে তাঁর গোলের ক্ষুধা এখনো শেষ হয়নি। যদি এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকে, তাহলে খুব শিগগিরই মিরোস্লাভ ক্লোসের সর্বকালের বিশ্বকাপ গোলের রেকর্ডও ভেঙে ফেলতে পারেন তিনি। আর তখন হয়তো ফুটবল বিশ্ব নতুন এক কিংবদন্তির সামনে মাথা নত করবে।


Post Comment