yesterday ipl match
yesterday ipl match
আইপিএল ২০২৬-এর উত্তেজনা যত এগোচ্ছে, ততই প্রতিটি ম্যাচ হয়ে উঠছে প্লে-অফের লড়াইয়ের অন্যতম বড় মঞ্চ। লখনউয়ের ভারতরত্ন অটল বিহারী বাজপেয়ী একানা স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত লখনউ সুপার জায়ান্টস এবং রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরুর এই ম্যাচটিও তার ব্যতিক্রম নয়। ম্যাচ শুরুর আগেই দুই শিবিরের পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। একদিকে আরসিবি ছিল পয়েন্ট টেবিলের ওপরের দিকে নিজেদের জায়গা শক্ত করার লড়াইয়ে, অন্যদিকে এলএসজি টিকে থাকার শেষ আশায় মাঠে নেমেছিল। সেই চাপ, আবহাওয়ার বাধা, বৃষ্টির নাটক এবং ব্যাটসম্যানদের বিস্ফোরক ইনিংস—সব মিলিয়ে ম্যাচটি পরিণত হয় এক জমজমাট ক্রিকেট নাটকে।
ম্যাচের শুরুতেই টসে জিতে বোলিং নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন আরসিবি অধিনায়ক রজত পাতিদার। একানা স্টেডিয়ামের পিচ নিয়ে ম্যাচ-পূর্ব আলোচনায় বিশেষজ্ঞরা বলেছিলেন, এখানে সাধারণত বোলাররা কিছুটা সাহায্য পান। বড় মাঠ হওয়ায় বাউন্ডারি মারা সহজ নয়, আর উইকেটে ফাটল থাকায় বল কখনও ধীর, কখনও অতিরিক্ত বাউন্স করতে পারে। সেই কারণেই প্রথমে বোলিং করার সিদ্ধান্তকে অনেকেই কৌশলগতভাবে সঠিক বলেই মনে করেছিলেন। তবে মাঠে যা ঘটল, তা আরসিবির পরিকল্পনাকে বেশ কয়েকবার এলোমেলো করে দেয়।
লখনউ সুপার জায়ান্টস ইনিংস শুরু করতে আসে মিচেল মার্শ এবং অর্শিন কুলকার্নি। অর্শিনের ওপেন করতে নামা অনেককেই অবাক করে, কারণ তিনি এই মরশুমে প্রথম ম্যাচ খেলছিলেন। শুরুতে ভুবনেশ্বর কুমারের নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ে এলএসজি কিছুটা ধীরগতিতে এগোচ্ছিল। কিন্তু দ্বিতীয় ওভার থেকেই ম্যাচের রং বদলাতে শুরু করেন মিচেল মার্শ। জশ হ্যাজলউডের বিরুদ্ধে তাঁর আক্রমণাত্মক ব্যাটিং স্পষ্ট করে দেয় যে তিনি আজ বড় ইনিংস খেলতে এসেছেন।
ঠিক সেই সময়েই আসে প্রথম বৃষ্টির বাধা। ম্যাচ থেমে যায়, কভার ঢেকে ফেলা হয় মাঠে। দর্শকরা কিছুটা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন, কারণ লখনউয়ের আকাশ তখন মেঘলা। যদিও খুব দ্রুতই বৃষ্টি থেমে যায় এবং খেলা ফের শুরু হয়। কিন্তু বিরতির পর যেন আরও ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠেন মার্শ। তিনি একের পর এক ছক্কা ও বাউন্ডারিতে আরসিবি বোলারদের ওপর চাপ বাড়াতে থাকেন।
বিশেষ করে রাসিখ সালাম দার এবং ক্রুণাল পান্ডিয়ার ওভারে তাঁর ব্যাট থেকে বেরিয়ে আসে একাধিক বিশাল শট। পাওয়ারপ্লে শেষে এলএসজির স্কোর ছিল উইকেট না হারিয়ে ৬৮ রান। মিচেল মার্শ তখন মাত্র ২৪ বলে ৫৮ রানে অপরাজিত। তাঁর ইনিংসে ছিল শক্তি, টাইমিং এবং দুর্দান্ত আত্মবিশ্বাসের মিশেল। লখনউয়ের সমর্থকেরা তখন গ্যালারিতে উৎসব শুরু করে দিয়েছেন।
অন্যদিকে আরসিবির বোলারদের মধ্যে হতাশা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। ভুবনেশ্বর কুমার অভিজ্ঞতা দিয়ে লাইন ধরে রাখার চেষ্টা করলেও অন্য প্রান্তে রান থামানো যাচ্ছিল না। জশ হ্যাজলউডের মতো বিশ্বমানের পেসারও সেদিন মার্শের সামনে কার্যত অসহায় হয়ে পড়েন। স্লোয়ার বল, বাউন্সার, ইয়র্কার—সব অস্ত্রই ব্যবহার করা হয়, কিন্তু মার্শের ব্যাট যেন প্রতিটি বলের উত্তর জানত।
এরপর আবারও নামে বৃষ্টি। দ্বিতীয়বারের মতো ম্যাচ থেমে যায়। এইবার বৃষ্টি ছিল তুলনামূলক বেশি জোরালো। মাঠকর্মীরা দ্রুত কভার টেনে দেন। ক্রিকেটপ্রেমীরা তখন আশঙ্কা করতে থাকেন ম্যাচ আদৌ শেষ হবে কি না। কিছুক্ষণ পরে অবশ্য বৃষ্টি কমে আসে এবং সুপার সপার মাঠ শুকানোর কাজ শুরু করে। পরে জানানো হয় ম্যাচ ১৯ ওভারে নামিয়ে আনা হয়েছে।
খেলা ফের শুরু হতেই ক্রুণাল পান্ডিয়া এলএসজিকে প্রথম ধাক্কা দেন। অর্শিন কুলকার্নি ১৭ রান করে আউট হন। যদিও সেই উইকেট আরসিবিকে খুব বেশি স্বস্তি দিতে পারেনি। কারণ অপর প্রান্তে মিচেল মার্শ তখন আরও বিধ্বংসী হয়ে উঠছেন। তাঁর সঙ্গে যোগ দেন নিকোলাস পুরান। ক্যারিবিয়ান এই ব্যাটার শুরু থেকেই মারকুটে মেজাজে ছিলেন।
মার্শ নিজের শতরান পূর্ণ করেন মাত্র ৪৯ বলে। রোমারিও শেফার্ডের ওভারে বাউন্ডারি মেরে শতরানে পৌঁছনোর মুহূর্তটি ছিল ম্যাচের অন্যতম সেরা দৃশ্য। গ্যালারিতে তখন দাঁড়িয়ে অভিবাদন জানান দর্শকরা। এটি ছিল তাঁর আইপিএল কেরিয়ারের দ্বিতীয় শতরান। চাপের ম্যাচে এমন ইনিংস নিঃসন্দেহে এলএসজির আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেয়।
মার্শের ইনিংসটি শুধু রানসংখ্যার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল না, তাঁর ব্যাটিংয়ের ধরনও ছিল অসাধারণ। কভার ড্রাইভ, পুল, ফ্লিক, লফটেড শট—সব দিকেই সমান দক্ষতা দেখিয়েছেন তিনি। বিশেষ করে স্পিনারদের বিরুদ্ধে তাঁর ফুটওয়ার্ক ছিল দারুণ। বড় মাঠেও তিনি এমনভাবে ফাঁকা জায়গা খুঁজে নিচ্ছিলেন যে ফিল্ডারদের কার্যত কিছু করার ছিল না।
নিকোলাস পুরানও নিজের স্বভাবসিদ্ধ আক্রমণাত্মক মেজাজে ব্যাটিং করেন। ভুবনেশ্বর কুমারের বিরুদ্ধে তাঁর বিশাল ছক্কা গ্যালারিকে উন্মাদ করে তোলে। শেষদিকে রিশভ পন্থও ছোট কিন্তু কার্যকর ক্যামিও খেলেন। মাত্র কয়েক বলের মধ্যেই তিনি কয়েকটি চারের পাশাপাশি বড় ছক্কা মারেন। তাঁর আগ্রাসী ব্যাটিং এলএসজিকে ২০০-র কাছাকাছি পৌঁছে দেয়।
যদিও শেষদিকে জশ হ্যাজলউড গুরুত্বপূর্ণ সময়ে মিচেল মার্শকে আউট করেন। ১১১ রানের ইনিংস খেলে মার্শ যখন ফেরেন, তখন এলএসজি ইতিমধ্যেই বিশাল স্কোরের ভিত তৈরি করে ফেলেছে। ডিপ ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্টে জ্যাকব বেথেলের ক্যাচটি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ততক্ষণে আরসিবির বোলারদের ওপর চাপ চরমে পৌঁছে গিয়েছে।
এই ম্যাচে আরসিবির অন্যতম বড় চিন্তার বিষয় ছিল তাদের বোলিংয়ের ধারাবাহিকতা। ভুবনেশ্বর কুমার নিজের ২০০তম আইপিএল ম্যাচ খেলতে নেমেছিলেন। ম্যাচের আগে তিনি বলেছিলেন, এই মাইলফলক তাঁর কাছে বিশেষ আবেগের। কিন্তু দলগতভাবে দিনটি তাঁর জন্য সহজ ছিল না। তিনি নিয়ন্ত্রিত বোলিং করলেও অন্যরা মার খাওয়ায় চাপ বেড়ে যায়।
আরসিবির ব্যাটিং লাইনআপ অবশ্য এই মরশুমে যথেষ্ট শক্তিশালী। বিরাট কোহলি দুর্দান্ত ফর্মে রয়েছেন। দেবদত্ত পাড়িক্কল এবং অধিনায়ক রজত পাতিদারও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। তবে এত বড় লক্ষ্য তাড়া করতে গেলে শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক হতে হবে। বিশেষ করে ফিল সল্ট চোটের জন্য বাইরে থাকায় জ্যাকব বেথেলের ওপর অতিরিক্ত দায়িত্ব থাকবে।
বিরাট কোহলির দিকেও নজর ছিল বিশেষভাবে। ম্যাচের আগে বলা হচ্ছিল, তিনি যদি আটটি ছক্কা মারতে পারেন, তাহলে আইপিএলে ওপেনার হিসেবে ২০০ ছক্কার বিশেষ রেকর্ড স্পর্শ করবেন। যদিও সেই লক্ষ্য পূরণ হবে কি না, তা নির্ভর করবে ম্যাচের পরিস্থিতির ওপর।
লখনউ সুপার জায়ান্টসের দিক থেকেও এই ম্যাচ ছিল মরশুম বাঁচানোর লড়াই। টানা হার, ব্যাটিং অর্ডারে ঘনঘন পরিবর্তন এবং বোলিংয়ের অনিয়মিত পারফরম্যান্স দলটিকে চাপে ফেলে দিয়েছিল। অধিনায়ক রিশভ পন্থ বিশেষ সমালোচনার মুখে ছিলেন। কিন্তু এই ম্যাচে দলের ব্যাটিং অন্তত প্রমাণ করল যে তারা এখনও লড়াই ছাড়েনি।
পিচ রিপোর্ট অনুযায়ী এই মাঠে সাধারণত ১৫৫-১৬০ রান প্রতিযোগিতামূলক ধরা হয়। সেখানে এলএসজি ১৯ ওভারের ম্যাচেই প্রায় ২০০ ছুঁয়ে ফেলে। অর্থাৎ ব্যাটসম্যানরা প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি সুবিধা পেয়েছেন। এর পেছনে মার্শের অসাধারণ ইনিংস যেমন ভূমিকা রেখেছে, তেমনই আরসিবির বোলিং পরিকল্পনার ঘাটতিও স্পষ্ট হয়েছে।
ম্যাচের আরেকটি আকর্ষণীয় দিক ছিল আবহাওয়া। বারবার বৃষ্টির জন্য খেলা থেমে যাওয়ায় খেলোয়াড়দের মনোযোগ ধরে রাখা সহজ ছিল না। কিন্তু মার্শ যেভাবে প্রতিবার বিরতির পর আরও আগ্রাসী হয়ে ফিরে এসেছেন, তা তাঁর মানসিক দৃঢ়তারই প্রমাণ।
একানা স্টেডিয়ামের দর্শকরাও ম্যাচটিকে বিশেষ করে তুলেছেন। বৃষ্টির মধ্যেও তারা গ্যালারি ছাড়েননি। প্রতিটি চার-ছক্কায় আওয়াজে কেঁপে উঠেছে স্টেডিয়াম। বিশেষ করে মিচেল মার্শের শতরানের সময় যে উচ্ছ্বাস দেখা যায়, তা আইপিএলের বড় মঞ্চের আবহকেই মনে করিয়ে দেয়।
এই ম্যাচ শুধু একটি লিগ ম্যাচ নয়, বরং দুই দলের ভবিষ্যতের দিক থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আরসিবি জিতলে প্লে-অফের দিকে আরও এক ধাপ এগিয়ে যাবে। অন্যদিকে এলএসজির কাছে এটি ছিল আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়ার লড়াই। সেই জায়গা থেকে দেখলে, তাদের ব্যাটিং পারফরম্যান্স নিঃসন্দেহে ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে।
ক্রিকেট বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মরশুমে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট আরও বেশি আক্রমণাত্মক হয়ে উঠেছে। ব্যাটসম্যানরা শুরু থেকেই বড় শট খেলতে পিছপা হচ্ছেন না। মিচেল মার্শের ইনিংস তারই নিখুঁত উদাহরণ। তিনি শুরু থেকেই বোলারদের ওপর চাপ তৈরি করেছেন এবং সেটি শেষ পর্যন্ত ধরে রেখেছেন।
আরসিবির জন্য এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হবে রান তাড়া করার সময় তাদের মানসিকতা কেমন থাকে। বড় ম্যাচে বিরাট কোহলির অভিজ্ঞতা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ হবে। একইসঙ্গে রজত পাতিদার, জিতেশ শর্মা এবং রোমারিও শেফার্ডদেরও দায়িত্ব নিতে হবে।
অন্যদিকে এলএসজির বোলিং আক্রমণেও নজর থাকবে। মোহাম্মদ শামি, প্রিন্স যাদব এবং শাহবাজ আহমেদদের সামনে কঠিন পরীক্ষা অপেক্ষা করছে। কারণ আরসিবির ব্যাটিং লাইনআপ বড় রান তাড়া করার ক্ষমতা রাখে।
সব মিলিয়ে লখনউয়ের এই ম্যাচ আইপিএল ২০২৬-এর অন্যতম নাটকীয় লড়াই হয়ে উঠেছে। বৃষ্টির বাধা, টসের সিদ্ধান্ত, মার্শের শতরান, পুরানের ঝড়ো ব্যাটিং, পন্থের ক্যামিও এবং আরসিবির চাপে পড়া বোলিং—সব উপাদানই ছিল এই ম্যাচে। ক্রিকেটপ্রেমীরা এমন ম্যাচই দেখতে চান, যেখানে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত উত্তেজনা বজায় থাকে।
আইপিএলের সৌন্দর্যই হল, এখানে একটি ইনিংস পুরো ম্যাচের চেহারা বদলে দিতে পারে। এদিন সেই কাজটি করেছেন মিচেল মার্শ। তাঁর ব্যাট থেকে বেরিয়ে আসা প্রতিটি শট যেন বার্তা দিচ্ছিল—লখনউ এখনও শেষ হয়ে যায়নি। এখন দেখার, আরসিবি সেই চ্যালেঞ্জের জবাব কীভাবে দেয় এবং ম্যাচের শেষ হাসি কে হাসে।
Post Comment